নয়াদিল্লি, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি যুদ্ধবিমান ‘তেজস’কে ঘিরে ফের অস্বস্তিকর প্রশ্ন। তেজসের উন্নত সংস্করণ তেজস এমকে-২ যখন বাস্তবে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে আসবে, তত দিনে সেটি কি সামনের সারির যুদ্ধবিমান হিসাবে প্রাসঙ্গিক থাকবে? প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কার্যত কোনও রাখঢাক রাখলেন না সদ্য অবসর নেওয়া বায়ুসেনার প্রাক্তন উপপ্রধান এয়ার মার্শাল নাগেশ কপূর। তাঁর সাফ মন্তব্য, ২০৩০-এর মাঝামাঝি সময়ে এমকে-২ পরিষেবায় ঢুকলে তা ‘অপারেশনাল’ ভাবে আর সামনের সারির যুদ্ধবিমান হিসাবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
চিন যখন পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান থেকে ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রযুক্তির দিকে দ্রুত এগোচ্ছে, পাকিস্তানও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছে—সেই পরিস্থিতিতে ২০৩৫-এর আশপাশে ভারত চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হাতে পেলে তা কতটা কার্যকর হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে কপূরের বক্তব্য, ‘‘না, অপারেশনালি, নিশ্চিত ভাবেই না।’’
তবে তেজস এমকে-২-কে পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় বলেও মনে করছেন না তিনি। তাঁর মতে, পঞ্চম বা ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান দিয়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তে প্রয়োজনীয় সংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা সম্ভব নয়। ফলে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি তুলনামূলক কম উন্নত কিন্তু কার্যকর বিমানও প্রয়োজন হবে। সেই জায়গায় এমকে-২-এর ভূমিকা থাকতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে সময় নিয়ে। তেজস প্রকল্পের প্রথম প্রোটোটাইপ উড়েছিল ২০০১ সালে। এর পরে তেজস এমকে-১-এর ৪০টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেয় বায়ুসেনা। আরও উন্নত এমকে-১এ সংস্করণের ৮৩টি বিমান কেনার জন্য ২০২১ সালে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার চুক্তিও হয়। পরে আরও ৯৭টি এমকে-১এ কেনার জন্য ২০২৫ সালে প্রায় ৬২,৩৭০ কোটি টাকার চুক্তি ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু এমকে-১এ সরবরাহের গতি নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। মার্কিন সংস্থা জেনারেল ইলেকট্রিকের এফ৪০৪ ইঞ্জিন সরবরাহে সমস্যা এবং রাডার, অ্যাভিয়নিক্স ও অস্ত্র-ব্যবস্থার সংযুক্তিকরণ সংক্রান্ত সমস্যার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সীমা পিছিয়েছে বলে দাবি৷
এই পরিস্থিতিতেই হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড বা HAL-এর ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছেন প্রাক্তন বায়ুসেনা কর্তা। তাঁর অভিযোগ, বায়ুসেনার প্রয়োজনীয় গতির সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির কাজের গতির সামঞ্জস্য নেই। দেশীয় যুদ্ধবিমান তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা মেনে নিয়েও তাঁর প্রশ্ন—দেশীয় প্রযুক্তির নামে আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?
তেজস এমকে-২-এর ক্ষেত্রেও সময়সীমা বার বার পিছিয়েছে। এক সময়ে ২০২২ সালে প্রোটোটাইপ সামনে আনার পরিকল্পনা ছিল। পরে সেই সময়সীমা একাধিক বার বদলায়। HAL-এর সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ফার্নবরো এয়ার শো-তে জানানো হয়েছিল, এমকে-২-এর প্রথম উড়ান ২০২৭ সালের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে হতে পারে।
এখানেই আরও বড় কৌশলগত প্রশ্ন তুলেছেন কপূর। তাঁর মতে, ভারতকে শুধু চতুর্থ বা সাড়ে চার প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের দিকে না তাকিয়ে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সঙ্গেও যুক্ত হতে হবে। সেই কারণেই ইউরোপের FCAS বা ব্রিটেন-ইতালি-জাপানের GCAP-এর মতো ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুলছেন না প্রাক্তন বায়ুসেনা উপপ্রধান। বরং তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে গতি, সময় এবং প্রযুক্তিগত প্রাসঙ্গিকতা। তেজস এমকে-২ যখন আকাশে উঠবে, তখন সেটি যেন ইতিমধ্যেই পিছিয়ে পড়া প্রযুক্তির প্রতীক না হয়ে যায়—মূল উদ্বেগ সেখানেই।
এই মন্তব্যের ফলে তেজস প্রকল্প ঘিরে পুরনো বিতর্কই নতুন করে সামনে এল, দেশীয় যুদ্ধবিমান তৈরি অবশ্যই জরুরি, কিন্তু প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কয়েক বছরের বিলম্বও কখনও কখনও প্রযুক্তিগত ভাবে এক প্রজন্ম পিছিয়ে দিতে পারে। আর চিন দ্রুত ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের দিকে এগোতে থাকায় সেই সময়ের মূল্যই এখন ভারতের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।