নয়াদিল্লি: তিন দশক ধরে আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে ‘সস্তা টাকা’র অন্যতম বড় ঠিকানা ছিল জাপান। প্রায় শূন্য সুদের জমানায় টোকিয়ো থেকে কম খরচে ঋণ নিয়ে সেই টাকা ডলার, ইউরো বা অন্য উচ্চ-রিটার্ন সম্পদে বিনিয়োগ করতেন ব্যাঙ্ক, হেজ ফান্ড এবং বড় বিনিয়োগকারীরা। ফলে জাপানি ইয়েন হয়ে উঠেছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান ‘funding currency’। কিন্তু সেই ছবিই এখন বদলাচ্ছে। জাপানে সুদের হার বাড়ছে, বিপরীতে চিনে ঋণের খরচ তুলনামূলক ভাবে কম। আমেরিকার সুদের হারের সঙ্গে চিনা borrowing cost-এর ব্যবধানও নতুন করে নজর কাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশ্ন উঠছে—ইয়েনের জায়গা কি ধীরে ধীরে দখল করতে চলেছে চিনা ইউয়ান?
তবে উত্তরটা সরল নয়। ইউয়ানের সামনে বড় সুযোগ তৈরি হলেও, চিনের capital controls, মুদ্রানীতিতে সরকারের বড় ভূমিকা এবং ইউয়ানের গতিপথ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাকে এখনও ইয়েনের পূর্ণ বিকল্প হতে দিচ্ছে না।
তিন দশকের ‘সস্তা ঋণ’-এর সাম্রাজ্যে ফাটল ইয়েনের উত্থানের পিছনে ছিল জাপানের দীর্ঘদিনের অতি-নিম্ন সুদের নীতি। বহু বছর ধরে জাপানে সুদের হার এতটাই কম ছিল যে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ইয়েনে ঋণ নেওয়া ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
ধরুন, কোনও বিনিয়োগকারী জাপান থেকে কম সুদে ইয়েনে ঋণ নিলেন। সেই ইয়েনকে ডলার বা অন্য মুদ্রায় বদলে এমন কোনও সম্পদে বিনিয়োগ করলেন, যেখান থেকে বেশি রিটার্ন পাওয়া যায়। ঋণের সুদ কম, বিনিয়োগের রিটার্ন বেশি—মাঝের ব্যবধানটাই লাভের সুযোগ। এই কৌশলই পরিচিত carry trade নামে।
কিন্তু জাপানের সুদের হার বাড়তে থাকায় সেই পুরনো সমীকরণ আর আগের মতো আকর্ষণীয় নেই। অর্থাৎ, ইয়েনে ঋণ নেওয়ার সুবিধা কমছে।
চিনে উল্টো ছবি
ঠিক এই জায়গাতেই ইউয়ানের সামনে সুযোগ। চিনে borrowing cost তুলনামূলক ভাবে কম থাকায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের একাংশের কাছে ইউয়েনে ঋণ নেওয়ার অর্থনৈতিক যুক্তি তৈরি হচ্ছে। আমেরিকার সুদের হারের সঙ্গে চিনের borrowing cost-এর ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থাৎ, এক দিকে জাপানে funding cost বাড়ছে, অন্য দিকে চিনে তুলনামূলক সস্তা টাকা পাওয়া যাচ্ছে। এই দুই প্রবণতা পাশাপাশি চলার ফলে বিশ্বের ‘funding currency’ হিসেবে ইউয়ানের গুরুত্ব বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। TOI/ET Prime-এর বিশ্লেষণেও এই yield-gap-কে ইউয়ানের সাম্প্রতিক আকর্ষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কিন্তু ইউয়ান কি সত্যিই নতুন ইয়েন হতে পারবে?
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ইয়েনের মতো আন্তর্জাতিক funding currency হয়ে উঠতে শুধু কম সুদের হার থাকলেই চলে না। প্রয়োজন গভীর ও সহজে ব্যবহারযোগ্য আর্থিক বাজার, বিপুল liquidity, অবাধ capital movement এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা। ইউয়ানের ক্ষেত্রে বড় বাধা capital controls।
চিনে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ এবং দেশ থেকে মূলধন বেরিয়ে যাওয়ার উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে কোনও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী যখন ইয়েনে carry trade করেন, তখন তাঁর সামনে যে পরিমাণ currency flexibility থাকে, ইউয়ানে তা এখনও নেই। এখানেই ইউয়ান ইয়েনের থেকে পিছিয়ে।
চিনের আর একটি সমস্যা—মুদ্রার দাম পুরোপুরি বাজারের হাতে নয়
ইউয়ানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আর একটি প্রশ্ন হল—চিনা মুদ্রার exchange rate কতটা market-driven? চিনা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নীতির প্রভাব ইউয়ানের গতিপথে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইউয়ানের মূল্য ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের হিসাব অনেক বেশি জটিল।
Carry trade-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনি কম সুদে ইউয়ানে ঋণ নিলেন ঠিকই, কিন্তু পরে যদি ইউয়ানের মূল্য উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যায়, তাহলে সেই ঋণ শোধ করার সময় আপনার খরচ বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ সস্তা borrowing + মুদ্রার সম্ভাব্য appreciation = carry trade-এর ঝুঁকি। TOI/ET Prime-এর বিশ্লেষণেও ইউয়ানের দীর্ঘমেয়াদি শক্তিশালী হওয়ার প্রবণতাকে সম্ভাব্য বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডলারকে টেক্কা নয়, প্রথমে ইয়েনকে চ্যালেঞ্জ
ইউয়ানের উত্থান নিয়ে আলোচনা হলেই অনেকে মনে করেন, চিন বুঝি সরাসরি ডলারের বিকল্প তৈরি করছে। বাস্তব ছবিটা আরও জটিল। বিশ্বের প্রধান reserve currency এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থান এখনও অনেক দূর এগিয়ে।
ইউয়ানের সামনে আপাতত আরও বাস্তব লক্ষ্য হল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ঋণ এবং বিনিয়োগে তার ব্যবহার বাড়ানো।
বিশেষ করে চিনের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলির ক্ষেত্রে ইউয়ানে settlement বাড়লে মুদ্রাটির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়বে। BRICS-এর মতো মঞ্চেও জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের আলোচনা ইউয়ানের ভূমিকাকে আরও গুরুত্ব দিতে পারে।
ভারতের জন্য এর অর্থ কী?
এই পরিবর্তনের দিকে ভারতেরও নজর রাখা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের বড় পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে রুপি, ডলার এবং আমদানি খরচের উপর। ভারতীয় সংস্থাগুলি যদি চিনের সঙ্গে আরও বেশি বাণিজ্য করে এবং ইউয়ানে settlement বাড়ে, তাহলে ডলারের উপর নির্ভরতা কিছু ক্ষেত্রে কমানো সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে ইউয়ানের আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়লে চিনের আর্থিক প্রভাবও বাড়বে। ফলে ভারতের কাছে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগতও। বিশেষ করে BRICS-এর সম্প্রসারিত অর্থনৈতিক ভূমিকা, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং ডি-ডলারাইজেশন নিয়ে আলোচনা যত বাড়বে, ততই ইউয়ানের গতিপথ ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাজারে বড় বদলের ইঙ্গিত
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল—ইউয়ান এখনও ইয়েনের জায়গা নেয়নি। কিন্তু বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা funding currency হিসেবে নতুন বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছেন। জাপানের সুদের হার বাড়া এবং চিনে তুলনামূলক কম borrowing cost—এই দুইয়ের মিলিত প্রভাব সেই অনুসন্ধানকে আরও জোরালো করছে।
তবে ইউয়ানের সামনে তিনটি বড় প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—
১. চিন কি capital controls আরও শিথিল করবে?
২. ইউয়ানের exchange rate কি আরও market-driven হবে?
৩. আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা কি দীর্ঘমেয়াদে ইউয়ানের liquidity ও policy framework-এর উপর ইয়েনের মতো আস্থা রাখবেন?
এই তিন প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে ইউয়ান শুধু ‘সস্তা ঋণের নতুন ঠিকানা’ হয়ে থাকবে, নাকি সত্যিই বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান funding currency হয়ে উঠবে। ইয়েনের পতন মানেই ইউয়ানের উত্থান—এমন সরল সমীকরণ এখনও তৈরি হয়নি। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট।
যে জাপান এক সময় বিশ্বের সস্তা টাকার কারখানা ছিল, সেখানে এখন সুদ বাড়ছে। আর চিন তুলনামূলক কম borrowing cost-এর সুবিধা পাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থবাজারে প্রশ্নটি এখন আর শুধু—‘ডলারের বিকল্প কে?’ বরং আরও বাস্তব প্রশ্ন—‘ইয়েনের পরে বিশ্বের পরবর্তী funding currency কি ইউয়ান?’ উত্তর এখনও নিশ্চিত নয়। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির মুদ্রার মানচিত্রে ইউয়ানের গুরুত্ব যে ধীরে ধীরে বাড়ছে, তাতে সন্দেহ কম।




