স্নিগ্ধা চৌধুরী
রাস্তা নেই, গাড়ি নেই, অ্যাম্বুল্যান্সও পৌঁছনোর উপায় নেই। চারপাশে শুধু জঙ্গল আর বৃষ্টিতে ভেজা দুর্গম পথ। এমন পরিস্থিতিতে গুরুতর অসুস্থ এক আদিবাসী মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন তাঁরাই, যাঁরা প্রতিদিন সেই দুর্গম পথকে সঙ্গী করেই জীবন কাটান। কয়েক কিলোমিটার ধরে কাঁধে তুলে অসুস্থ মালয়াপ্পনকে নিয়ে ছুটলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেই হৃদয়ছোঁয়া ছবি ফের সামনে এনে দিল প্রত্যন্ত এলাকার চিকিৎসা পরিষেবার নির্মম বাস্তবতা।
কেরলের ইদুক্কি জেলার এডামালাকুড়ি। পাহাড় আর গভীর জঙ্গলে ঘেরা এই এলাকায় জীবনযাত্রা এমনিতেই কঠিন। তার উপর বর্ষা নামলেই যেন প্রকৃতি আরও কঠিন পরীক্ষা নেয়। টানা বৃষ্টিতে জঙ্গলের পথ হয়ে ওঠে পিচ্ছিল, কাদায় ভরে যায় রাস্তা। কোথাও জল জমে, কোথাও ভেঙে যায় চলার পথ। আর সেই পথ দিয়েই প্রতিদিন জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে যাতায়াত করতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের।
এই এলাকার কুডাল্লারকুড়ির বাসিন্দা মালয়াপ্পন গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন। প্রবল জ্বরের সঙ্গে ছিল তীব্র পেটের ব্যথা ও সারা শরীরে যন্ত্রণা। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। বাড়িতে থেকেই কোনওরকমে সময় কাটছিল। কিন্তু বুধবার সকালে পরিস্থিতি আর সামলানো গেল না।
তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেই হবে।
কিন্তু কীভাবে?
বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টির প্রভাব। জঙ্গলের রাস্তা প্রায় অচল। কোনও অ্যাম্বুল্যান্স সেই দুর্গম পথ ধরে এগিয়ে আসার অবস্থায় নেই। গাড়ি নিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। কয়েক কিলোমিটার দূরের চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছনোই যেন অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তবু অসুস্থ মানুষটিকে বাড়িতে ফেলে রাখা যায় না।
তখনই স্থানীয় বাসিন্দারা সিদ্ধান্ত নেন, যে করেই হোক মালয়াপ্পনকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে হবে। হাতের কাছে যা ছিল, তা দিয়েই তৈরি করা হয় অস্থায়ী স্ট্রেচার। মালয়াপ্পনকে তাতে শুইয়ে কাঁধে তুলে নেন কয়েকজন।
তারপর শুরু হয় সেই অসম্ভব যাত্রা।
একজন কাঁধ থেকে ভার নামালে অন্যজন এগিয়ে আসেন। কাদায় পা পিছলে যায়, আবার উঠে দাঁড়ান তাঁরা। সামনে কখনও সরু জঙ্গলের পথ, কখনও পাথুরে জমি, কখনও বৃষ্টিতে ভিজে থাকা বিপজ্জনক ঢাল। কিন্তু কারও মুখে বিরক্তি নেই। কারণ প্রত্যেকেই জানেন, তাঁদের সামান্য দেরিও অসুস্থ মানুষটির জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
কয়েক কিলোমিটার পথ এভাবেই পেরিয়ে যেতে হয়।
এই যাত্রায় কোনও সাইরেনের শব্দ ছিল না। ছিল না আধুনিক অ্যাম্বুল্যান্সের চাকা। ছিল শুধু মানুষের হাঁপিয়ে ওঠা নিঃশ্বাস, কাদায় পা ফেলার শব্দ আর একজন মানুষকে সুস্থ করে ফেরানোর অদম্য চেষ্টা।
অবশেষে তাঁরা পৌঁছন আনাক্কুলামে। এতক্ষণ কাঁধে করে নিয়ে আসার পর সেখানে মালয়াপ্পনকে একটি অটোরিকশায় তোলা হয়। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় আদিমালি তালুক হাসপাতালে। সেখানে শুরু হয় তাঁর চিকিৎসা।
ঘটনাটি সামনে আসতেই ফের আলোচনায় এসেছে এডামালাকুড়ির মতো দুর্গম এলাকার মানুষের চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার সমস্যা। একজন মানুষ গুরুতর অসুস্থ হলে যেখানে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন, সেখানে এই এলাকার মানুষের প্রথম লড়াইটাই হয় হাসপাতালে পৌঁছনোর জন্য।
বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। পাহাড়ি জঙ্গলের রাস্তা সামান্য বৃষ্টিতেই বিপজ্জনক হয়ে যায়। প্রবল বৃষ্টিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হলে জরুরি পরিষেবা পৌঁছনো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় স্থানীয় মানুষকেই নিজেদের উদ্যোগে অসুস্থদের উদ্ধার করতে হয়।
মালয়াপ্পনের ঘটনাটি তাই শুধু একটি উদ্ধার অভিযানের গল্প নয়। এটি একদিকে যেমন দুর্গম এলাকার মানুষের অসহায়তার ছবি, তেমনই অন্যদিকে নিঃস্বার্থ মানবিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ।
ভাবুন, নিজের বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে কয়েকজন মানুষ বৃষ্টিভেজা জঙ্গলের পথে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁদের কাঁধে এমন একজন, যিনি নিজে হাঁটতে পারছেন না। তাঁরা জানেন না সামনে পথ কতটা কঠিন। জানেন না আর কতটা দূর যেতে হবে। শুধু জানেন, মানুষটিকে হাসপাতালে পৌঁছতেই হবে।
সেই মুহূর্তে তাঁদের কাঁধ শুধু একটি স্ট্রেচার বহন করেনি। বহন করেছে একটি পরিবারের আশা, একজন অসুস্থ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, কোনও মানুষকে চিকিৎসা পেতে যদি এমন পথ পেরোতে হয়, তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজন কতটা জরুরি? একটি দুর্গম এলাকার মানুষের জীবনও তো একই রকম মূল্যবান। জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার তাঁদেরও সমান।
মালয়াপ্পন শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছেছেন। কিন্তু তাঁর সেই যাত্রা যেন নীরবে বলে গেল আরও বড় একটি কথা, যেখানে রাস্তা শেষ হয়ে যায়, সেখানে মানুষের মানবিকতাই পথ দেখায়। আর অ্যাম্বুল্যান্স না পৌঁছলেও, কখনও কখনও মানুষের কাঁধই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসা।