কলকাতা: বিধানসভায় মঙ্গলবারের একটি কর্মসূচি ঘিরে তৃণমূলের অন্দরের সমীকরণ নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। হালিশহরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়ে হামলার অভিযোগের প্রতিবাদে কালীঘাটপন্থী বিধায়কদের কর্মসূচিতে দেখা গেল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়-শিবিরের তিন বিধায়ককে। শুধু বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নয়, পরে সাংবাদিক বৈঠকেও কালীঘাটপন্থী নেতাদের পাশে দেখা গেল তাঁদের। আর তার পরেই কুণাল ঘোষের দাবি—এই তিন জনই শেষ কথা নয়, ঋতব্রত-শিবিরের আরও প্রায় ২০ জন বিধায়ক খুব শীঘ্রই এই শিবিরে যোগ দিতে পারেন। কুণালের এই দাবিকে ঘিরেই এখন তৃণমূলের অন্দরে কৌতূহল তুঙ্গে।
বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বিধানসভায় তৃণমূলের অন্দরে যে বিভাজন তৈরি হয়েছিল, মঙ্গলবারের ঘটনাকে তারই নতুন অধ্যায় বলে দেখছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। ‘সই জাল’ সংক্রান্ত বিতর্কের পর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসাবে মানতে অস্বীকার করেছিলেন দলের একাংশ বিধায়ক। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল পৃথক গোষ্ঠী। এমনকি দলের নাম এবং প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও সামনে এসেছিল। নিউটাউনের একটি অভিজাত হোটেলে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের বৈঠকেও ওই শিবিরের একাধিক বিধায়কের উপস্থিতির খবর প্রকাশ্যে এসেছিল।
এই আবহেই হালিশহরের ঘটনা নতুন রাজনৈতিক মোড় তৈরি করেছে। রবিবার হালিশহরের এক মৃত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার পথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট, পাথর ও কাদা ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। তার প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিধানসভার ভিতরে কর্মসূচি করেন কালীঘাটপন্থী বিধায়কেরা। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, পুলক রায়, বিনা মণ্ডল, কুণাল ঘোষ, আলিফা আলী আহমেদ এবং বাবর আলীদের মতো নেতারা সেখানে ছিলেন।
কিন্তু নজর আটকে যায় তিন জনকে ঘিরে—বারুইপুরের বিভাস সর্দার ওরফে ভব, বসিরহাট উত্তরের তৌসিফুর রহমান এবং মেটিয়াবুরুজের আব্দুল খালেক মোল্লা। তিন জনই অতীতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠীর পাশে প্রকাশ্যে দাঁড়িয়েছিলেন। দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের সময় তাঁদের স্বাক্ষর করা চিঠির কথাও সামনে এসেছিল। নিউটাউনের বৈঠকেও তাঁদের উপস্থিতির খবর ছিল। সেই তিন বিধায়কই এ দিন কালীঘাটপন্থী কর্মসূচিতে এসে নতুন করে রাজনৈতিক প্রশ্ন তুললেন।
শুধু বিক্ষোভে অংশ নেওয়াই নয়, বিধানসভার প্রেস কর্নারে সাংবাদিক বৈঠকেও তাঁদের কালীঘাটপন্থী নেতাদের সঙ্গে পাশাপাশি বসতে দেখা যায়। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এ কি নিছক মমতার উপর হামলার প্রতিবাদ, নাকি শিবির বদলের আগাম ইঙ্গিত?
বিভাস সর্দার অবশ্য সেই জল্পনায় সরাসরি সিলমোহর দেননি। তাঁর বক্তব্য, ‘‘কে কোন পন্থী সেটা ভুলে যান।’’ জোড়াফুল প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে বিধানসভায় এসেছেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার অভিযোগের প্রতিবাদ করা তাঁর কর্তব্য—এই অবস্থানই স্পষ্ট করেছেন তিনি। ভবিষ্যতেও এমন কর্মসূচিতে থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি এখন ঠিক কোন শিবিরে রয়েছেন, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন বিভাস।
আব্দুল খালেক মোল্লা আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিনি এখনও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোষ্ঠীতেই রয়েছেন। তবে মমতার উপর হামলার অভিযোগের প্রতিবাদে অংশ নেওয়াকে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে নারাজ। তাঁর যুক্তি, মমতার দেওয়া জোড়াফুল প্রতীকে জয়ী হয়েই তিনি বিধানসভায় এসেছেন। ফলে তাঁর উপর আক্রমণের প্রতিবাদ করা তাঁর দায়িত্ব।
তৌসিফুর রহমানের বক্তব্যেও উঠে এসেছে মমতার সঙ্গে বসিরহাটের রাজনৈতিক সম্পর্ক। তাঁর কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানেই বসিরহাট, বসিরহাট মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।’’ অন্য কারও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অভিপ্রায় পূরণ করতে তিনি কর্মসূচিতে আসেননি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে তিন বিধায়কের বক্তব্যের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে কুণাল ঘোষের দাবি। তাঁর বক্তব্য, ঋতব্রত-শিবিরের আরও প্রায় ২০-২৩ জন বিধায়ক এ দিনের কর্মসূচিতে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা কারণে, বিশেষ করে পুলিশের ‘আনুষঙ্গিক চাপ’-এর কারণে তাঁরা শেষ পর্যন্ত আসতে পারেননি বলে দাবি কুণালের। তাঁর দাবি, খুব শীঘ্রই তাঁদের একাংশ কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের দিকে চলে আসবেন।
স্বভাবতই কুণালের এই দাবিই তৃণমূলের অন্দরে কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, তিন জন বিধায়কের উপস্থিতি যদি নিছক একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়, তা হলে আরও ২০ জনের সম্ভাব্য যোগদানের দাবি কি শুধুই রাজনৈতিক বার্তা? নাকি সত্যিই ঋতব্রত-শিবিরের ভিতরে বড় ধরনের টানাপড়েন শুরু হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী কয়েক দিনে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে তৃণমূলের অন্দরে যে বিভাজন প্রকাশ্যে এসেছিল, তা এখনও পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি। বরং হালিশহরের ঘটনা সেই পুরনো ক্ষতকে ফের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।
এক দিকে মমতার উপর হামলার প্রতিবাদে একই মঞ্চে দাঁড়াচ্ছেন দুই শিবিরের বিধায়কেরা, অন্য দিকে কালীঘাটপন্থী শিবিরের দাবি—আরও প্রায় ২০ জন বিধায়ক আসতে পারেন। ফলে বিধানসভার অন্দরের অঙ্ক এখন তিন বিধায়কের উপস্থিতিতে থেমে নেই। প্রশ্নটা আরও বড়—সত্যিই কি আরও ২০ জন আসছেন?