বাঁকুড়া: এত দিন সতর্ক করা হত, অচেনা নম্বর থেকে আসা কোনও লিঙ্কে ক্লিক করবেন না। অচেনা কোনও ফাইল ডাউনলোড করবেন না। কিন্তু সাইবার প্রতারকেরা সেই সতর্কতারও ‘জবাব’ খুঁজে ফেলেছে। এ বার অচেনা নম্বর নয়, প্রতারণার ফাঁদ আসছে পরিচিত নম্বর থেকেই। সরকারি আধিকারিক কিংবা জনপ্রতিনিধির হোয়াটসঅ্যাপ দখল করে তাঁদের পরিচিতদের কাছে পাঠানো হচ্ছে APK ফাইল। ফাইলের সঙ্গে বার্তা—‘ট্রাফিক আইন ভাঙার জরিমানা হয়েছে।’ জরিমানার আতঙ্কে কেউ ফাইলটি খুললেই বিপদ। কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতায় হাতছাড়া হতে পারে মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ, তার সঙ্গে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকাও।
বাঁকুড়া জেলা পুলিশের কাছে এমন প্রতারণার কৌশল সামনে আসার পরেই সতর্কবার্তা জারি হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, শুধু অচেনা নম্বর নয়, এখন পরিচিত নম্বর থেকেও আসা কোনও APK ফাইল বা সন্দেহজনক লিঙ্ক যাচাই না করে খোলা যাবে না। কারণ, যে নম্বর থেকে বার্তা আসছে, সেটি হয়তো পরিচিত কোনও ব্যক্তি বা আধিকারিকের। কিন্তু বার্তাটি পাঠাচ্ছে সাইবার প্রতারক।
এক পুলিশ আধিকারিকের কথায়, ‘‘এত দিন অচেনা নম্বর থেকে আসা কোনও ফাইল বা লিঙ্ক ডাউনলোড না করার জন্য মানুষকে সতর্ক করা হত। এখন পরিচিত নম্বর থেকেও হঠাৎ কোনও ফাইল বা লিঙ্ক এলে তা এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে।’’
নজরে জনপ্রতিনিধি, আধিকারিক
পুলিশের অনুমান, প্রতারকেরা প্রথমে কোনও সরকারি আধিকারিক বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের দখল নিচ্ছে। তার পরে ওই ফোনে থাকা পরিচিতদের নম্বরে একে একে পাঠানো হচ্ছে প্রতারণার বার্তা। ফলে প্রাপকের কাছে নম্বরটি অপরিচিত নয়। বরং পরিচিত মানুষের নম্বর দেখে সন্দেহ আরও কমে যাচ্ছে।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন কৌশল—‘ট্রাফিক জরিমানা’। গাড়ির বিরুদ্ধে জরিমানা হয়েছে শুনে অনেকেই স্বাভাবিক ভাবেই বিষয়টি জানতে চাইবেন। সেই সুযোগে পাঠানো হচ্ছে APK ফাইল। পুলিশের আশঙ্কা, উদ্বেগ এবং তাড়াহুড়ো—এই দু’টিকেই হাতিয়ার করছে প্রতারকেরা।
এক ক্লিকেই বিপদ
তদন্তকারীদের মতে, APK ফাইল সাধারণত অ্যান্ড্রয়েড ফোনে অ্যাপ ইনস্টলের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু অপরিচিত উৎস থেকে আসা APK-তে ক্ষতিকর সফটওয়্যার থাকতে পারে। সেটি ফোনে ইনস্টল করার পরে প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়ে ফেললে প্রতারকেরা ফোনের বিভিন্ন তথ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপের উপর নজরদারি বা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
বিপদ আরও বাড়ে মোবাইলে ব্যাঙ্কিং অ্যাপ থাকলে। অনলাইন লেনদেনের জন্য এখন প্রায় সব ব্যাঙ্কেরই অ্যাপ রয়েছে। ফলে ফোনের নিয়ন্ত্রণ কোনও ভাবে প্রতারকের হাতে চলে গেলে লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য, SMS বা OTP-র মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতানোর চেষ্টা হতে পারে। তার পর দ্রুত অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা সরিয়ে দেওয়াই লক্ষ্য।
বাঁকুড়ায় আগেই খোয়া গিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত কর্তার টাকা
বাঁকুড়া সাইবার ক্রাইম থানা সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক মাস আগেই APK ফাইলের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হন জেলার এক অবসরপ্রাপ্ত বিএসএনএল আধিকারিক। অবসরের পরে পাওয়া মোটা অঙ্কের টাকা তাঁর দু’টি সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা ছিল। ব্যাঙ্কের নাম করে তাঁকে একটি APK ফাইলের লিঙ্ক পাঠানো হয়। সেটি ডাউনলোড করার পরেই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উধাও হয়ে যায় বলে অভিযোগ।
তদন্তকারীদের বক্তব্য, সচেতনতা বাড়ায় প্রতারকেরা এখন আর আগের মতো ফোন করে সরাসরি ATM পিন, কার্ডের তথ্য বা OTP জানতে চাইছে না। বরং ব্যবহারকারীর ফোনটিকেই হাতিয়ার করার চেষ্টা করছে।
‘গাড়িই নেই’, তাই ফাঁস হল ছক
তবে নতুন এই কৌশল সব জায়গায় সফল হচ্ছে না। পুলিশের নজরে এসেছে, এমন বহু ব্যক্তির কাছেও ট্রাফিক জরিমানার নামে APK ফাইল পাঠানো হয়েছে, যাঁদের কোনও গাড়িই নেই। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আরও অনেকে সতর্ক হয়েছেন।
পুলিশের বক্তব্য, প্রতারণার এই পদ্ধতিতে সবচেয়ে বড় বিপদ হল—পরিচিত মানুষের নম্বর দেখেই অনেকে বিশ্বাস করে ফেলেন। তাই নম্বরটি পরিচিত হলেও আচরণ অস্বাভাবিক হলে সতর্ক হতে হবে।
জরিমানা সত্যি কি না, যাচাই কোথায়?
পুলিশের পরামর্শ, ট্রাফিক জরিমানার কথা জানিয়ে কোনও APK ফাইল পাঠানো হলে সেটি কোনও ভাবেই ডাউনলোড করা যাবে না। জরিমানার তথ্য সত্যি কি না, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি ট্রাফিক পরিষেবা বা সরকারি ওয়েবসাইটে গিয়ে যাচাই করতে হবে। কোনও পরিচিত ব্যক্তির নম্বর থেকে অস্বাভাবিক বার্তা এলে সরাসরি ফোন করে নিশ্চিত হওয়াই নিরাপদ।
সাইবার প্রতারণার পুরনো ফাঁদে এখন নতুন মোড়। আগে প্রশ্ন ছিল—‘নম্বরটি অপরিচিত কি না?’ এখন তার সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন যোগ হয়েছে—‘পরিচিত নম্বরের আড়ালে সত্যিই পরিচিত মানুষটিই আছেন তো?’