কলকাতা: রক্তের এক ফোঁটা জীবন বাঁচাতে পারে। অথচ সেই জীবনদায়ী রক্তই যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ না মেপে সংগ্রহ করা হয়, তা হলে প্রশ্ন উঠবেই নিরাপত্তা নিয়ে। রাজ্যজুড়ে রক্তদান শিবিরের ছবি ঘিরে এমনই গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ, বহু শিবিরে রক্ত সংগ্রহের সময় ব্লাড ব্যাগের ওজন মাপার কোনও ব্যবস্থা নেই। ফলে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম না বেশি—কতটা রক্ত দাতার শরীর থেকে নেওয়া হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভুল ভাবে জানা যাচ্ছে না।
প্রশাসন সূত্রের খবর, গত কয়েক মাসে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার একাধিক রক্তদান শিবিরে ওজন মাপার যন্ত্র দেখা যায়নি। শ্রদ্ধানন্দ পার্ক, বরানগর বাজারে এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের উদ্যোগে আয়োজিত শিবির কিংবা করুণাময়ীতে সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাঙ্কের তত্ত্বাবধানে হওয়া শিবির—কোথাও এমন যন্ত্র না থাকার অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ, রক্ত সংগ্রহ হচ্ছে, কিন্তু সেই রক্তের পরিমাণ নির্দিষ্ট মানদণ্ডে যাচাই হচ্ছে কি না, তা নিয়েই বড় প্রশ্ন।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই ওজন মাপা? চিকিৎসা-বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু ব্যাগের গায়ে লেখা ৩৫০ বা ৪৫০ মিলিলিটার দেখে সংগ্রহ থামিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। রক্তের সঙ্গে ব্যাগের নিজস্ব ওজন এবং রক্ত জমাট বাঁধা আটকানোর জন্য থাকা অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট সলিউশনের ওজনও হিসাবের মধ্যে থাকে। ৩৫০ মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাগ-সহ মোট ওজন আদর্শ সীমায় পৌঁছলেই রক্ত নেওয়া বন্ধ করা প্রয়োজন।
সমস্যা আরও গুরুতর হতে পারে অতিরিক্ত রক্ত সংগ্রহ হলে। কারণ ব্লাড ব্যাগে নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্তের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট মেশানো থাকে। রক্তের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে সেই অনুপাত বদলে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে মাইক্রোক্লট তৈরি হওয়া এবং রক্তের গুণমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগী বা সদ্যোজাত শিশুর মতো সংবেদনশীল রোগীদের ক্ষেত্রে এমন রক্ত ব্যবহারে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—রক্তদান শিবিরে যখন রক্তের গুণমান এবং দাতার নিরাপত্তা দু’টিই গুরুত্বপূর্ণ, তখন প্রয়োজনীয় ওজন মাপার যন্ত্র থাকবে না কেন? সরকারি এবং বেসরকারি—দু’ধরনের শিবির নিয়েই অভিযোগ উঠেছে। ফলে বিষয়টি কোনও একটি সংস্থার গাফিলতি হিসেবে দেখলে চলবে না বলেই মত রক্তদান আন্দোলনের কর্মীদের।
রক্তদান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের দাবি, অবিলম্বে প্রতিটি রক্তদান শিবিরে রক্ত সংগ্রহের উপযুক্ত ওজন মাপার যন্ত্র বাধ্যতামূলক করা হোক। কারণ রক্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘চোখের আন্দাজ’ কোনও ভাবেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকল্প হতে পারে না।
জীবন বাঁচানোর উদ্দেশ্যে যে মানুষ স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে আসছেন, তাঁর শরীর থেকে ঠিক কতটা রক্ত নেওয়া হল—সেটুকু নিশ্চিত করার দায় ব্যবস্থারই। আর সেই জায়গাতেই যদি মাপার যন্ত্র অনুপস্থিত থাকে, তা হলে প্রশ্নটা শুধু একটি রক্তদান শিবিরের নয়। প্রশ্ন উঠে যায় গোটা রক্তসংগ্রহ ব্যবস্থার নজরদারি এবং নিরাপত্তা নিয়েই।