কলকাতা: চারপাশের সব মোবাইলে নেটওয়ার্ক। কারও ফোনে কথা হচ্ছে, কারও মোবাইলে দিব্যি ইন্টারনেট চলছে। অথচ আপনার ফোনের পর্দায় হঠাৎ ‘নো সার্ভিস’! এক বার নয়, মিনিট দশেক নয়—টানা আধঘণ্টা ধরে। সাধারণ নেটওয়ার্ক বিভ্রাট ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন না। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি কখনও কখনও ‘সিম সোয়্যাপ’ বা ডুপ্লিকেট সিম জালিয়াতির বড় সতর্কসংকেত হতে পারে। সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় দীর্ঘক্ষণ অস্বাভাবিক ভাবে মোবাইল নেটওয়ার্ক চলে গেলে দ্রুত পুলিশ বা সাইবার বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কী ভাবে কাজ করে এই প্রতারণা? অভিযোগ, প্রতারকেরা বিভিন্ন জায়গা থেকে কোনও গ্রাহকের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে। তার পর জাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট টেলিকম সংস্থার কাছ থেকে ওই নম্বরের ডুপ্লিকেট সিম বার করার চেষ্টা করে। নতুন সিম সক্রিয় হয়ে গেলে আসল গ্রাহকের হাতে থাকা সিমটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। ফলে আচমকাই ফোনে নেটওয়ার্ক উধাও।
আর সেই মুহূর্তটাই প্রতারকদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মোবাইল নম্বরটি যদি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ইউপিআই, ক্রেডিট কার্ড কিংবা অনলাইন ব্যাঙ্কিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তা হলে ফোনে আসা গুরুত্বপূর্ণ এসএমএস বা ওটিপি পৌঁছে যেতে পারে প্রতারকের হাতে। কলকাতাতেও অতীতে সন্দেহজনক সিম-সোয়্যাপের সঙ্গে ব্যাঙ্ক জালিয়াতির যোগের অভিযোগ সামনে এসেছে।
ফলে গ্রাহক যখন ভাবছেন, ‘নেটওয়ার্কের সমস্যা’, তখন অন্য প্রান্তে শুরু হয়ে যেতে পারে অ্যাকাউন্টে ঢোকার চেষ্টা। সাইবার বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, নেটওয়ার্ক হারানোর সঙ্গে যদি ব্যাঙ্কের কোনও সতর্কবার্তাও না আসে, তা-ও বিপদের কারণ হতে পারে—কারণ সিমটি যদি প্রতারকের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, লেনদেনের এসএমএসও গ্রাহকের ফোনে নাও পৌঁছতে পারে।
তবে প্রতিবার নেটওয়ার্ক চলে গেলেই যে সিম-সোয়্যাপ হয়েছে, এমন নয়। টেলিকম পরিষেবায় প্রযুক্তিগত সমস্যা, স্থানীয় টাওয়ারের গোলমাল বা ফোনের নিজস্ব সমস্যাতেও ‘নো সার্ভিস’ দেখা দিতে পারে। কিন্তু যেখানে আশপাশের অন্য ফোনে নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক, সেখানে শুধু নিজের ফোনে দীর্ঘক্ষণ সংযোগ না থাকা অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
তাহলে কী করবেন? প্রথমে ফোন এক বার রিস্টার্ট করে বা এয়ারপ্লেন মোড চালু-বন্দ করে দেখুন। তাতেও নেটওয়ার্ক না ফিরলে অন্য কারও ফোন থেকে নিজের টেলিকম সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। একই সঙ্গে ব্যাঙ্ককে বিষয়টি জানান এবং প্রয়োজন হলে ইউপিআই, কার্ড ও অনলাইন ব্যাঙ্কিং সাময়িক ভাবে সুরক্ষিত করার অনুরোধ করুন। টাকা বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত সরকারি ব্যবস্থায় অভিযোগ জানান।
সাইবার নিরাপত্তার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ—যেখানে সম্ভব, শুধুমাত্র এসএমএস-নির্ভর ওটিপির বদলে অথেন্টিকেটর অ্যাপ-ভিত্তিক দ্বি-স্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবহার করা। সিম-সোয়্যাপ হলে এসএমএসের নিয়ন্ত্রণ প্রতারকের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
অর্থাৎ, মোবাইলের ‘নো সার্ভিস’ লেখা সব সময় নিছক নেটওয়ার্কের গোলমাল নয়। আপনার চারপাশে নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক, অথচ আপনার সিম আধঘণ্টা বা তার বেশি সময় ধরে নিস্তব্ধ—তখন বিষয়টিকে আর পাঁচটা প্রযুক্তিগত সমস্যার মতো দেখবেন না। কয়েক মিনিটের অবহেলাই কখনও কখনও বড় আর্থিক বিপদের দরজা খুলে দিতে পারে।