কলকাতা: সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডে তাঁরা কখনও সরকারি কর্মী ছিলেন না, আবার সম্পূর্ণ বহিরাগতও নন। রোগীর বাড়ির লোকের ডাকে ছুটে যাওয়া, অসুস্থকে খাওয়ানো, স্নান করানো, শৌচাগারে নিয়ে যাওয়া, রাত জেগে পাশে বসে থাকা-দশকের পর দশক ধরে এই কাজই ছিল তাঁদের পরিচয়। পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হাসপাতালগুলিতে 'সাধারণ আয়া' নামে পরিচিত এই কর্মীদের অস্তিত্ব এবার কার্যত সংকটের মুখে। বসিরহাট সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে আগামী ৩১ অগস্টের পর অননুমোদিত আয়াদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে।
হাসপাতাল সূত্রের খবর, বসিরহাটে প্রায় ১৫০ জন সাধারণ আয়া এই সিদ্ধান্তে সরাসরি কর্মহীন হওয়ার মুখে। তবে শুধু বসিরহাট নয়, স্বাস্থ্য মহলের একাংশের মতে, একই নীতি যদি রাজ্যের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও কার্যকর করা হয়, তবে হাজার হাজার আয়ার জীবিকা এবং রোগী পরিষেবার একটি দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা এক ধাক্কায় ভেঙে পড়তে পারে।
সরকারি নথিতে তাঁদের কোনও পদ নেই। বেতনও পান না সরকারের কাছ থেকে। রোগীর পরিবার সরাসরি পারিশ্রমিক দেয়। অথচ বাস্তবে সরকারি হাসপাতালের পরিষেবার এক নীরব স্তম্ভ হয়ে উঠেছিলেন এই আয়ারাই। বিশেষ করে বয়স্ক, শয্যাশায়ী ও অসহায় রোগীদের দৈনন্দিন পরিচর্যার বড় অংশ তাঁদের কাঁধেই থাকত।
আয়াদের দাবি, ২০০৯ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে স্বাস্থ্য দফতর হাসপাতালে অননুমোদিত বহিরাগতদের প্রবেশে কড়াকড়ির নির্দেশিকা জারি করেছিল। তবে তাঁদের বক্তব্য, পরবর্তী সময়েও মানবিক কারণে তাঁরা হাসপাতালগুলিতে রোগীদের সেবা করার সুযোগ পেয়েছেন। এবার সেই ব্যবস্থারই ইতি টানতে চলেছে প্রশাসন।
বসিরহাটের দীর্ঘদিনের আয়া সুমিত্রা দাস বলেন, “৩০-৪০ বছর ধরে হাসপাতালে কাজ করছি। কোনও দিন সরকারি কর্মচারী ছিলাম না। রোগীদের সেবা করেই সংসার চালিয়েছি। করোনার সময়ও ভয় না পেয়ে কাজ করেছি। এখন যদি হাসপাতালেই ঢুকতে না দেওয়া হয়, তাহলে পরিবার নিয়ে কোথায় যাব?”
আর এক আয়া সুনীতা বিবির গলায় হতাশা আরও স্পষ্ট। তাঁর কথায়, “৩১ অগস্টের পর থেকে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানানো হয়েছে। বাড়িতে ক্যানসারের রোগী রয়েছে। এই আয়ের উপরই পুরো পরিবার নির্ভর করে। হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে গেলে বাঁচব কী করে?”
শুধু জীবিকার প্রশ্ন নয়, রোগী পরিষেবার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নার্স বলেন, “সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপের তুলনায় নার্সের সংখ্যা অনেক কম। ওয়ার্ডের দৈনন্দিন পরিচর্যার কাজে আয়ারা বড় ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা না থাকলে সেই চাপ পুরোপুরি নার্সদের উপর এসে পড়বে। তার প্রভাব রোগী পরিষেবাতেও পড়তে পারে।”
একই আশঙ্কা রোগীর পরিজনদেরও। তাঁদের বক্তব্য, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা চিকিৎসার দায়িত্ব সামলালেও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার ক্ষেত্রে এই আয়ারাই অনেক সময় পরিবারের সদস্যের মতো পাশে থাকেন। বিশেষ করে প্রবীণ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা একা ভর্তি থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে হাসপাতাল প্রশাসনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। বসিরহাট স্বাস্থ্য জেলার বিএমওএইচ রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, অননুমোদিত আয়াদের হাসপাতালে কাজ করার কোনও আইনি ভিত্তি বা সরকারি অনুমোদন নেই। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী হাসপাতাল পরিচালনা করতেই হাসপাতাল সুপার এবং রোগী কল্যাণ সমিতি (আরকেএস) যৌথভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। আয়ারা অভিযোগ করছেন, সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের অবস্থান বদলেছে। তবে প্রশাসনের তরফে সেই অভিযোগ মানা হয়নি। তাদের দাবি, সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক এবং বিদ্যমান নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে।
বসিরহাটের ঘটনাকে ঘিরে এখন বড় প্রশ্ন উঠছে— সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডে বহু বছর ধরে গড়ে ওঠা এই অনানুষ্ঠানিক পরিষেবা ব্যবস্থা কি এবার অতীত হতে চলেছে? যদি তাই হয়, তবে শুধু কয়েকশো আয়ার রুজিরুটি নয়, রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগী পরিচর্যার প্রচলিত ব্যবস্থাও নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ, যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণে বিকল্প ব্যবস্থা কত দ্রুত গড়ে তোলা যাবে, সেই উত্তর এখনও অজানা।