রবীন্দ্র সংগীত পেটে ভাত জোগায় নি। জোগাড় করে দেয়নি সংসারের অর্থ। পেট চালাতে তিনি এখন একজন নিরাপত্তারক্ষী। কিন্তু মনে বাস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। এককালে বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের ছাত্র। প্রাক্তন হিসেবে রবীন্দ্রনাথ তার মননে। পেট চালাতে যখন নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলাতে হয় তখন তার মনে গুনগুন করে ওঠে রবীন্দ্র সংগীত।
কর্মজীবনে তিনি নিরাপত্তারক্ষী হলেও বহু ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে তিনি এক রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাস্টারমশাই। পেশার বাধ্যবাধকতা কোনদিন থামাতে পারেনি রবীন্দ্রচর্চা। শান্তিনিকেতনের গুরু পল্লীর বাসিন্দা বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের প্রাক্তনী শোভন চক্রবর্তী আজ বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা। একদিকে যখন রিমিক্সের বাড়বাড়ন্ত তখন এমন এক রবীন্দ্র প্রেমী মানুষ সবার কাছে অনুপ্রেরণা।
শোভন চক্রবর্তী আজও রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গী করেই জীবনযাপন করছেন। তার কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুধু গান নয়, বেঁচে থাকার অবলম্বন। সংসারের অভাব, পেটের খিদার কাছে নিজের সঙ্গীতশিক্ষা মাঝপথে থমকে গেলেও শোভন এখন বহু ছাত্রছাত্রীর গানের মাস্টারমশাই।
ছোটবেলায় মা পুতুল চক্রবর্তীর হাত ধরে সংগীতে প্রবেশ। শান্তিনিকেতনের সংগীত ভবনে রবীন্দ্র সংগীতের তালিম নিয়েছেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু মাথার উপর সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক অনটনের কারণে মাঝ পথেই ছেড়ে দিতে হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে। কিন্তু মনেপ্রাণে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাধনা। একটা সময় বহু ছাত্র-ছাত্রী রবীন্দ্র সংগীত শিখেছেন শোভনের কাছে। তার কন্ঠে গান শুনলে পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষ দাঁড়িয়ে শোনেন। আর তাতেই নিজের শান্তি খুঁজে পান শোভন। তার এমন নিখুঁত সুর এবং নিবিড় ভালোবাসা রবীন্দ্র সংগীতের প্রতি শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন মহল্লায় তার সুরের জাদুতে আজও মুগ্ধ হন ছোট-বড় অনেকেই।
শোভন জানিয়েছে, করোনা মহামারীর পর বদলে যায় সেই পরিচিত ছবি। একের পর এক কমতে থাকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখানো থেকে নিয়মিত আয়ও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সংসার চালানোর তাগিদে বাধ্য হয়েই বেছে নিতে হয় বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীর কাজ।
পেশা বদলালেও বদলায়নি তার পরিচয়। দিনের শেষে নিরাপত্তারক্ষীর পোশাক খুলে আবার ফিরে আসেন সেই চেনা জগতে - রবীন্দ্রনাথের গানে। তবে অর্থাভাবে কারও কাছে হাত পাততে নারাজ শোভন। রবীন্দ্র সংগীতের প্রতিটি লাইন তার কাছে ভরসার। তাতেই নিজের জীবনের প্রতিটি ছন্দ মেলে ধরেন।
অর্থসাহায্য নয়, তার একমাত্র চাওয়া রবীন্দ্রসংস্কৃতির পরিসর আরও বিস্তৃত হোক। কেউ তার কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখে উপকৃত হন তাহলে নিজের শ্রমের যথাযথ পারিশ্রমিক নিতে আপত্তি নেই। নিছকই সাহায্যের নামে অর্থ গ্রহণে অনীহা তার।
শোভন চক্রবর্তীর কথায়, রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গী করেই শান্তিনিকেতনে রয়েছি। তার গানই আমার সঙ্গী। নিরাপত্তারক্ষীর কাজের পাশাপাশি কেউ গান শুনলে বা শিখতে চাইলে সানন্দে গ্রহণ করব। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার জীবনে সুখ এবং পরম প্রাপ্তি। শান্তিনিকেতনের মাটিতে এমন মানুষই হয়তো মনে করিয়ে দেয় জীবিকার প্রয়োজনে নিরাপত্তারক্ষীর পোশাক পরলেও তার হৃদয়ে আজও বেজে চলে রবীন্দ্রনাথের গান। সুর আর স্বপ্নের এক অনন্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন এই নিরাপত্তা রক্ষী রবীন্দ্র সংগীতপ্রেমী।