ঝাড়গ্রাম, রেশমি ব্যানার্জি - চক ডাস্টারের চেনা গণ্ডি পেরিয়ে, কখনও প্রকৃতির কোলে , কখনও পটচিত্রের মাধ্যমে, আবার কখনও টেলিস্কোপ হাতে পড়ুয়াদের শেখানো। প্রযুক্তি, প্রকৃতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতির অভিনব মেলবন্ধনে পড়াশোনাকে সহজ করে তোলার সেই উদ্যোগ এবার পেল জাতীয় স্বীকৃতি। ঝাড়গ্রামের নয়াগ্রাম গভর্নমেন্ট মডেল স্কুলের ভূগোল শিক্ষক শান্তনু পাত্র পেতে চলেছেন জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার ২০২৬। আগামী ৫ ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে এই সম্মান তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে।
২০১৭ সাল থেকে নয়াগ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করছেন হুগলির তারকেশ্বরের বাসিন্দা শান্তনু পাত্র। তাঁর কাছে পড়াশোনা মানে শুধু বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকা নয়। পড়ুয়াদের নিজস্ব ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে পাঠ্য বিষয়কে যুক্ত করে তিনি তৈরি করেছেন শিক্ষার নতুন পরিবেশ।
পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ কিংবা ভূমিক্ষয়ের মতো বিষয় পড়াতে তিনি ব্যবহার করেছেন পটচিত্র, পটগান, ঝুমুর ও বাহা গান। পড়ুয়াদের নিয়ে পৌঁছে গিয়েছেন প্রকৃতির মাঝেও। প্রাচীন মন্দির বা স্থাপত্য দেখিয়ে তার নির্মাণ পদ্ধতি বোঝানোর পাশাপাশি পরে সেই বিষয়ে পরীক্ষা নিয়েছেন। তাঁর উপলব্ধি, পাঠ্য বইয়ের কঠিন ভাষার বদলে আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পড়ালে পড়ুয়ারা বিষয় দ্রুত বুঝতে পারে।
শুধু প্রাচীন সংস্কৃতি নয়, আধুনিক প্রযুক্তিকেও শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করেছেন সান্তনু। স্কুলের কম্পিউটার কক্ষকে তৈরি করেছেন 'ডিজিটাল হাব'। এর পাশাপাশি, রয়েছে 'ডিসকাশন প্ল্যাটফর্ম' ও 'ক্রিয়েশন সেন্টার'। ডিজিটাল মাধ্যমে শেখার পর পড়ুয়ারা আলোচনায় অংশ নেয় এবং শেখা বিষয় বাস্তবে প্রয়োগ করে। এমনকি, গ্রহ নক্ষত্রের অধ্যায় পড়ানোর সময় টেলিস্কোপের মাধ্যমে আকাশ পর্যবেক্ষণের সুযোগও দেওয়া হয়। বৃক্ষরোপণ, জৈবসার তৈরি, গাছের পরিচর্যার পাশাপাশি বাবুই ঘাস ও তাল পাতা দিয়ে বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
তিনি শিক্ষার পরিসর ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশের সীমানার বাইরেও। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অসম, গুজরাট, ঝাড়খণ্ডের স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের পাশাপাশি জাপানের টোকিওর পড়ুয়াদের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি হয়েছে নয়াগ্রামের ছাত্র-ছাত্রীদের। ভাষাগত বাধা দূর করতে শিক্ষকরা অনুবাদ করে দুই দেশের পড়ুয়াদের কথোপকথনে সাহায্য করেছেন। জাপানের পড়ুয়ারা চিঠি পাঠিয়েছে তাঁদের ভারতীয় বন্ধুদের।
শান্তনুর এই অভিনব শিক্ষণপদ্ধতিতেই মুগ্ধ হয়েছেন জাতীয় স্তরের নির্বাচকমন্ডলী। এবছর দেশের ৪৮ জন শিক্ষক জাতীয় শিক্ষক পুরস্কার পাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সান্তনু। ১৯৯০ এর দশকের শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতকোত্তর, ২০১০ সালে শিক্ষকতা শুরু এবং ২০১৭ সালে নয়াগ্রাম গভর্নমেন্ট মডেল স্কুলে যোগদান - এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ জাতীয় স্বীকৃতি। তাঁর সাফল্যে খুশি স্কুল কর্তৃপক্ষ ও পড়ুয়ারা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক অনুপম রায়ের কথায়, পড়ুয়াদের সহজ ভাবে শেখাতে শান্তনুর নিরন্তন চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়।
নিজের এই সাফল্যের কৃতিত্ব অবশ্যই একা নিতে নারাজ সান্তনু। তাঁর কথায়, এই সম্মানের কোনও প্রত্যাশাই তাঁর ছিল না। শিক্ষক ও পড়ুয়াদের সহযোগিতাতেই এই সম্মান। খবরটি শুনে নাকি শুধু চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এসেছিল। এমনকি, পুরস্কারের সঙ্গে পাওয়া আর্থিক সহায়তাও তাঁর নিজের জন্য নয়, পড়ুয়াদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্কুলের কাজে খরচ করতে চান তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার ভাবনাকে যখন জাতীয় স্তরে সম্মান দেওয়া হয়, সেই স্বীকৃতি অত্যন্ত আবেগের।
প্রিয় 'ভূগোল স্যারের' এই সাফল্যে উচ্ছ্বাসিত পড়ুয়ারা। স্কুল কর্তৃপক্ষেরও দাবি, শান্তনুর এই সম্মান শুধু নয়াগ্রাম স্কুলের নয়, গোটা ঝাড়গ্রামের গর্ব।