প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা শেষ করে কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর হাজার হাজার ভারতীয় তরুণ-তরুণী আমেরিকায় কাজের স্বপ্ন দেখেন। সেই স্বপ্নপূরণের অন্যতম বড় সেতু H-1B ভিসা। কিন্তু সেই পথই এবার কঠিন হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন সিনেটে পেশ হওয়া একটি নতুন বিল আইনে পরিণত হলে টানা তিন বছরের জন্য নতুন H-1B ভিসা দেওয়া বন্ধ হতে পারে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে কর্মসূচি চালু হলেও তা হবে আরও কঠোর শর্তে। একই সঙ্গে প্রতিটি H-1B আবেদনের জন্য ১ লক্ষ মার্কিন ডলার ফি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
ভারতীয় আইটি শিল্পে কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
বিলটি প্রকাশ্যে আসতেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, মেটা, এনভিডিয়া-সহ আমেরিকার বহু প্রযুক্তি সংস্থা ভারতীয় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডেটা সায়েন্টিস্ট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য দক্ষ কর্মীদের উপর দীর্ঘদিন ধরেই নির্ভরশীল। ভারতের বহু আইটি সংস্থাও H-1B ভিসার মাধ্যমে কর্মীদের আমেরিকায় পাঠায়। ফলে এই বিল কার্যকর হলে শুধু চাকরিপ্রার্থীরাই নন, ভারতীয় আইটি শিল্পও বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
কেন এই বিল আনলেন রিপাবলিকান সিনেটর?
মন্টানার রিপাবলিকান সিনেটর টিম শিহি ‘এন্ড H-1B অ্যাবিউজ অ্যাক্ট’ নামে বিলটি সিনেটে পেশ করেছেন। তাঁর দাবি, H-1B কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীর অভাব পূরণ করা। কিন্তু বহু সংস্থা এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করে কম খরচে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে, যার ফলে আমেরিকানদের চাকরির সুযোগ কমছে।
শিহির বক্তব্য, “H-1B কর্মসূচি কখনওই সস্তা বিদেশি শ্রমিক এনে আমেরিকানদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। এই বিল সেই অপব্যবহার বন্ধ করবে এবং আমেরিকান কর্মীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে।”
তিন বছরের জন্য বন্ধ হতে পারে নতুন H-1B ভিসা
প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে, আগামী তিন বছরের জন্য কোনও নতুন H-1B ভিসা ইস্যু করা হবে না। এই সময়ের মধ্যে পুরো কর্মসূচি পুনর্বিবেচনা করা হবে। পরে আবার ভিসা চালু হলেও বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর নিয়ম, সীমিত অনুমোদন এবং কঠিন যোগ্যতার ভিত্তিতে আবেদন গ্রহণ করা হবে।
১ লক্ষ ডলারের ফি, কেন এত বিতর্ক?
ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিটি H-1B আবেদনের জন্য ১ লক্ষ মার্কিন ডলার ফি ধার্য করেছিল। কিন্তু একটি ফেডারেল আদালত সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে জানায়, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এমন ফি আরোপ করা যায় না। নতুন বিলে সেই ফিকেই আইনের মাধ্যমে স্থায়ী করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই নিয়ম কার্যকর হলে বিদেশি কর্মী নিয়োগের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। ফলে বহু সংস্থা H-1B কর্মী নিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারে।
বদলে যাবে ভিসা বাছাইয়ের নিয়মও
বর্তমানে H-1B ভিসা লটারির মাধ্যমে দেওয়া হয়। নতুন বিলে সেই ব্যবস্থা তুলে দিয়ে বেতনভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ যে সংস্থা বেশি বেতন দিতে রাজি, তাদের আবেদন অগ্রাধিকার পাবে। পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের স্টাফিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ এবং একাধিক সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করার সুযোগও বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
গ্রিন কার্ডের পথও কঠিন হতে পারে
প্রস্তাবিত আইনে ‘ডুয়াল ইনটেন্ট’ সুবিধা তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে H-1B ভিসাধারীরা অস্থায়ী কর্মভিসায় থেকেও গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন। নতুন বিল আইনে পরিণত হলে সেই সুযোগ আর নাও থাকতে পারে। পাশাপাশি H-শ্রেণির ভিসাধারীরা পরিবারের সদস্যদের আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগও হারাতে পারেন।
বিদেশি পড়ুয়াদের উপরও কড়া নজর
শুধু চাকরিজীবীরাই নন, বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রেও কড়া অবস্থান নিয়েছে বিলটি। Optional Practical Training (OPT)-এর মতো কর্মসূচি বন্ধ করে বিদেশি ছাত্রছাত্রী এবং নির্দিষ্ট এক্সচেঞ্জ ভিসাধারীদের কাজের অনুমতি তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন ফেডারেল সরকারি সংস্থাগুলিকে অ-অভিবাসী ভিসাধারীদের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও বলা হয়েছে।
আইন হতে এখনও বাকি একাধিক ধাপ
এই বিলকে সমর্থন জানিয়েছে Immigration Accountability Project এবং Federation for American Immigration Reform (FAIR)। তবে বিলটি এখনও আইনে পরিণত হয়নি। প্রথমে সিনেট, তারপর প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন এবং সবশেষে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন। ফলে আইন হওয়ার পথে এখনও একাধিক সাংবিধানিক ধাপ বাকি।
ভারতীয়দের জন্য কতটা বড় প্রভাব?
প্রতি বছর লক্ষাধিক ভারতীয় H-1B ভিসার জন্য আবেদন করেন। তাঁদের বড় অংশ আমেরিকার তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা, স্বাস্থ্য এবং প্রকৌশল খাতে কাজের সুযোগ পান। তাই এই বিল আইনে পরিণত হলে শুধু ভারতীয় চাকরিপ্রার্থীরাই নন, ভারতীয় আইটি শিল্প, বহুজাতিক সংস্থা এবং ভারত-আমেরিকা প্রযুক্তিগত সহযোগিতার উপরও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে। যদিও আপাতত এটি একটি প্রস্তাবিত বিল, তবুও মার্কিন অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবেই একে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।




