রেশমি ব্যানার্জি, কলকাতা: কেটে গিয়েছে প্রায় চার চারটে বছর। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছিল ভাদু খুনের অন্যতম অভিযুক্ত মসাদ শেখ। এই চারটে বছরে বদলেছে একাধিক ঠিকানা। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছিল মুম্বাইতে। আর সেই মুম্বাই থেকেই গ্রেফতার করা হলো অভিযুক্ত মসাদ শেখকে। গোপন সূত্রে খবরের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। শুক্রবার মুম্বইয়ের ডোংরি থানার ওয়াড়িবন্দর এলাকার টোব্যাকো গলি থেকে তাকে পাকড়াও করা হয়।
বীরভূমের রামপুরহাট থানার বগটুই গ্রামের বাসিন্দা মসাদ শেখ। দীর্ঘদিন থেকে তিনি সেখানেই বসবাস করতেন। ২০২২ সালে তার বিরুদ্ধে ওঠে একটি অভিযোগ। ওই সালের ২১ শে মার্চ তৃণমূল নেতা তথাবড়শাল পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ভাদু শেখ খুনের ঘটনা ঘটে। আর সেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল মাথার মসাদ শেখের বিরুদ্ধে। এই খুনের ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিল সে। রামপুরহাট আদালত তাকে ঘোষিত অপরাধী ঘোষণা করে। কিন্তু কোনভাবেই পুলিশের জালে ধরা পড়ছিল না আভাযুক্ত। বারংবার নিজের আস্থানা বদলাচ্ছিল সে। দীর্ঘ চার বছর অপেক্ষার পর পুলিশের জালে ধরা পড়ে মসাদ।
মসাদ শেখের গ্রেফতারের পর শুক্রবার মুম্বইয়ের আদালতে মসাদকে পেশ করে সিবিআই। তদন্তের প্রয়োজনে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসার জন্য ট্রানজ়িট রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করে। শনিবার বর্ধমানের সিজেএম আদালতে তাকে পেশ করা হয়। বিচারবিভাগীয় হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার বর্ধমানের তৃতীয় জেলা ও দায়রা আদালতে তাকে পেশ করা হবে বলে আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে।
জানা গিয়েছে, ২০২২ সালের ২১শে মার্চ রাতে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার রামপুরহাট ব্লকের বগটুই গ্রামে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। অভিশপ্ত ওই রাতে বগটুই মোড়ের কাছে চায়ের দোকানের সামনে মোবাইলে কথা বলছিলেন ভাদু। সেই সময় বাইকে চেপে আসা দুষ্কৃতীরা তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। বোমা ও গুলিতে গুরুতর জখম হন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপরই রীতিমত রণক্ষেত্রের চেহারা নয় গোটা এলাকা।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বগটুই। ভাদু শেখের মৃত্যুর পর তার অনুগামীরা উত্তেজিত হয়ে তান্ডব চালায় গোটা গ্রামে। একের পর এক বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। সেই আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় একাধিক বাড়ি। তাতে শিশু ও মহিলা-সহ ১০ জনের মৃত্যু হয়। এই নৃশংস ঘটনা কে কেন্দ্র করে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে গোটা দেশ জুড়ে।
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে এই ঘটনার তদন্তভার যায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তথা সিবিআই এর উপর। এই খুনের মামলায় একাধিক দফায় চার্জশিট জমা করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মসাদ-সহ তিন জনের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত চার্জশিট পেশ করা হয়।
২০২৪ সালে সাত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বর্ধমান আদালত। সেই সময়ই মসাদকে ঘোষিত অপরাধী ঘোষণা করা হয়েছিল। তারপর থেকেই তার খোঁজে অন্যে হয়ে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছিল পুলিশ। কিন্তু দীর্ঘদিন সে গা ঢাকা দেয়। পুলিশের প্রচেষ্টায় অবশেষে মুম্বাই থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
এই ঘটনা রীতিমতো আতঙ্ক ধরিয়েছিল গোটা বকটুই গ্রামে। একের পর এক প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। এই নৃশংস হত্যা লীলায় নিরীহ শিশু ও নারীদের প্রাণ গিয়েছিল। রাজ্যের পালাবদলের পর এই ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত পুলিশের জালে। তাই ন্যায় বিচারের আশায় গোটা গ্রাম।