রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর বিজেপির সামনে যে প্রশ্নটি ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে, তার নাম—তোলাবাজি। বিরোধী আসনে থাকাকালীন যে অভিযোগকে হাতিয়ার করে তৃণমূলকে নিশানা করেছিল বিজেপি, ক্ষমতায় আসার পর সেই একই অভিযোগ যদি দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের ঘিরে ওঠে, তা হলে অস্বস্তি এড়ানোর উপায় নেই। বোলপুর-শান্তিনিকেতন থেকে কেশপুর, আরামবাগ, এমনকী শহর কলকাতাতেও একাধিক এলাকায় বিজেপির নাম করে টাকা চাওয়ার অভিযোগ ঘিরে সেই অস্বস্তিই এখন প্রকাশ্যে। আর তাই অভিযোগকারীদের সামনে আনতে এ বার ‘গোপন পথ’ খুলে দিল দল।
বোলপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল বুধবার দলীয় কার্যালয়ে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, কেউ তোলাবাজির শিকার হলে সরাসরি প্রকাশ্যে মুখ খুলতে না পারলেও লিখিত ভাবে, প্রয়োজনে সম্পূর্ণ গোপনে, প্রমাণ-সহ অভিযোগ জানাতে পারবেন। দলের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
অভিযোগের ক্ষেত্রও কম নয়। একাধিক এলাকায় হোটেল, লজ, হোমস্টে, নতুন বাড়ি তৈরির কাজ থেকে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বলে দলীয় সূত্রে খবর। অর্থাৎ অভিযোগের কেন্দ্র শুধু বড় ব্যবসা নয়; স্থানীয় নির্মাণকাজ থেকে পর্যটন-নির্ভর ছোট ব্যবসাও সেই তালিকায় চলে আসছে। তবে অভিযোগ উঠেছে মানেই তা সত্যি—এমনটা ধরে নেওয়া হচ্ছে না। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, প্রমাণ যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই ঘটনার তাৎপর্য বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিক কড়া বার্তার দিকে। তোলাবাজি নিয়ে দলের কর্মীদের উদ্দেশে কার্যত ‘ডেডলাইন’ দিয়েছিলেন শমীক। তাঁর বক্তব্য ছিল, বিজেপির নাম বা পতাকা ব্যবহার করে কেউ তোলাবাজি করলে তা বরদাস্ত করা হবে না। এমনকি তিনি দলীয় কর্মীদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘শুধরে যান’, নইলে দলীয় স্তরে কঠোর ব্যবস্থা হবে। শমীক একই সঙ্গে স্বীকার করেছিলেন, দু’-একটি জায়গায় ‘বিচ্যুতি’ হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে রাতারাতি বিজেপিতে আসা নেতা-কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
শুধু সতর্কবার্তাতেই থামেননি রাজ্য সভাপতি। প্রশাসনিক স্তরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কঠোর হাতে ব্যবস্থা নিচ্ছেন, আর সাংগঠনিক স্তরে বিজেপিও পদক্ষেপ করছে—এই বার্তাও দিয়েছিলেন শমীক। অর্থাৎ ‘দলের নাম করে টাকা’ নেওয়ার অভিযোগকে নিছক বিরোধীদের প্রচার বলে উড়িয়ে না দিয়ে, দলীয় নেতৃত্ব বিষয়টিকে বাস্তব সমস্যা হিসাবেই দেখছে।
শমীকের সেই বার্তার পরেও অভিযোগের খবর সামনে আসায় স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—১৫ দিনের হুঁশিয়ারিতে কতটা কাজ হল? সম্প্রতি বিজেপির বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে বোলপুরের ‘গোপন অভিযোগ’ ব্যবস্থা কার্যত সেই একই সমস্যার আর একটি সাংগঠনিক সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই জায়গাতেই প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা বর্তমান মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। শমীকের পরে তোলাবাজি নিয়ে দলের নতুন বিধায়কদেরও সতর্ক করেছেন তিনি। ক্ষমতায় এসে ‘ক্ষমতার নেশায়’ ভেসে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে দিলীপের বার্তা—জনপ্রতিনিধি হওয়া মানে মানুষের উপর দাদাগিরি করার লাইসেন্স পাওয়া নয়। দলের নাম ভাঙিয়ে টাকা তোলার প্রবণতা বরদাস্ত করা হবে না।
দিলীপের বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব অন্য জায়গায়। কারণ বিজেপির বহু বছরের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘কাটমানি’, ‘সিন্ডিকেট’ এবং ‘তোলাবাজি’র অভিযোগ। ভোটের আগে সাধারণ মানুষের কাছে বিজেপির প্রতিশ্রুতির অন্যতম অংশ ছিল—ক্ষমতা বদলালে এই সংস্কৃতির অবসান হবে। ফলে সরকার বদলের পরে একই ধরনের অভিযোগ যদি পদ্মশিবিরের স্থানীয় নেতাদের ঘিরে উঠতে থাকে, তা হলে শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও জড়িয়ে যায়।
আর এখানেই বোলপুরের ঘটনা আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ প্রকাশ্যে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হল স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য। একজন ছোট ব্যবসায়ী, বাড়ি তৈরি করতে যাওয়া সাধারণ মানুষ কিংবা হোটেল-হোমস্টে মালিক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী কর্মীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে অনেক সময় পিছিয়ে যেতে পারেন। ভয় থাকতে পারে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া, নির্মাণকাজে বাধা, সামাজিক চাপ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশোধের। সেই জায়গায় পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটাই এখন দেখার।
তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। রাজনৈতিক অভিযোগকে সরাসরি অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। বিজেপির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, অভিযোগের সঙ্গে প্রমাণ থাকলে তা যাচাই করা হবে। অর্থাৎ ফোনে টাকা চাওয়ার রেকর্ড, বার্তা, ভিডিয়ো, লেনদেনের নথি বা প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য—যা কিছু রয়েছে, তার ভিত্তিতেই তদন্ত হওয়া উচিত। নইলে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগও ‘তোলাবাজি’র তকমা পেতে পারে।
রাজ্যের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তোলাবাজির অভিযোগ সাধারণত শুরু হয় স্থানীয় স্তরে। রাস্তা, বাড়ি, দোকান, বাজার, বালি-পাথর, নির্মাণকাজ, পরিবহণ, হোটেল কিংবা ছোট শিল্প—যেখানে প্রশাসন ও রাজনীতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ, সেখানেই ‘দলের লোক’ পরিচয়ের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে পারে।
তাই শমীকের ১৫ দিনের হুঁশিয়ারি, দিলীপের ‘ক্ষমতার নেশায় ভাসবেন না’ সতর্কতা এবং বোলপুরে শ্যামাপদ মণ্ডলের ‘গোপনে অভিযোগ করুন’ বার্তা—তিনটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে বিজেপির সামনে সমস্যাটার ছবিটা স্পষ্ট হয়। দল ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে আসা স্থানীয় প্রভাবের অপব্যবহার ঠেকানো এখন নতুন পরীক্ষা।
রাজনৈতিক পালাবদলের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল—‘আগের মতো চলবে না’। সেই দাবি সত্যি কি না, তার পরীক্ষা এখন থানায় নয়, মানুষের দরজায়। কোনও ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষ দলীয় পতাকা দেখে টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন কি না, কেউ অভিযোগ করতে ভয় পাচ্ছেন কি না, আর অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সত্যিই দলীয় শাস্তির মুখে পড়ছেন কি না—এই তিন প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে বাংলায় তোলাবাজির সংস্কৃতি বদলেছে, না কি শুধু পতাকার রং বদলেছে।
বিজেপির সামনে তাই এখন শুধু অভিযোগ শোনার ব্যবস্থা তৈরির প্রশ্ন নয়। আসল পরীক্ষা—গোপন অভিযোগ সত্যি হলে সেই অভিযোগের দরজা থেকে সরাসরি দলীয় শাস্তির দরজা পর্যন্ত কত দ্রুত পৌঁছনো যায়। সেটাই হয়ে উঠতে পারে ‘তোলাবাজিমুক্ত বাংলা’র সবচেয়ে বড় মাপকাঠি।