রাজনীতির প্রতিবাদের ভাষা কি বদলে যাচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয় এবং বিজেপির উত্থানের পর একের পর এক তৃণমূল নেতাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনায় যে ছবি দেখা গিয়েছিল, এ বার যেন তারই প্রতিধ্বনি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ইউরোপের কসোভোয়। সেখানে সংসদের অধিবেশন চলাকালীন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তিকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়লেন বিরোধী দলের এক সাংসদ। মুহূর্তে উত্তপ্ত হয়ে উঠল সভাকক্ষ। শেষ পর্যন্ত অধিবেশনই স্থগিত করতে হল।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ফল প্রকাশের পর তৃণমূল নেতাদের ঘিরে এমন একাধিক ডিম-ছোড়ার ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও নেতাকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়েছে, কোথাও গাড়ি লক্ষ্য করে উড়ে এসেছে ডিম। এমনকি বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে ঘটে যাওয়া সমস্ত ডিম-ছোড়ার ঘটনার রিপোর্ট এবং দায়ের হওয়া FIR-এর তথ্য চেয়েছে।
আর তার মধ্যেই কসোভোর সংসদের দৃশ্য যেন সেই বিতর্ককে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে এল।
সংসদের ভিতরেই প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে ডিম
কসোভোর পার্লামেন্টে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই সময় বিরোধী সাংসদ টাইম কাদ্রিজাজ প্রধানমন্ত্রী কুর্তির দিকে ডিম ছোড়েন। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যান এবং পরে অধিবেশন স্থগিত হয়ে যায়। অর্থাৎ, যে প্রতিবাদ সাধারণত স্লোগান, ওয়াকআউট বা বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা, তা এ বার সংসদের ভিতরে ডিম ছোড়ার পর্যায়ে পৌঁছল।
বাংলায় শুরু, বিদেশেও একই ছবি?
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে ডিম এখন কার্যত প্রতিবাদের একটি দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভোটে তৃণমূলের বড় পরাজয়ের পর দলের একাধিক নেতা বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন। তাঁদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হয়েছে।
ফলে কসোভোর সংসদে প্রধানমন্ত্রীর দিকে ডিম ছোড়ার দৃশ্য সামনে আসতেই স্বাভাবিক ভাবেই বাংলার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ছবির সঙ্গে তুলনা টানা হচ্ছে।
তবে দু’দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়
তুলনাটি দৃশ্যের—রাজনৈতিক পরিস্থিতির নয়। পশ্চিমবঙ্গে ডিম ছোড়ার ঘটনাগুলি মূলত নির্বাচনের ফল, রাজনৈতিক ক্ষোভ এবং তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সামনে এসেছে। অন্য দিকে কসোভোয় ঘটনার পিছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে তীব্র সংঘাত। কসোভোয় নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক সমীকরণে স্থিতিশীলতা আসেনি। ফলে সংসদের ভিতরে উত্তেজনাও বাড়ছিল। সেই পরিস্থিতিরই বিস্ফোরক প্রকাশ ঘটেছে ডিম ছোড়ার ঘটনায়।
ডিম কেন প্রতিবাদের অস্ত্র?
রাজনৈতিক প্রতিবাদে ডিম ব্যবহারের একটা আলাদা প্রতীকী অর্থ রয়েছে। গুলি বা বোমার মতো প্রাণঘাতী নয়, কিন্তু প্রকাশ্যে কাউকে অপমান করার দৃশ্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট। ফলে ক্যামেরার সামনে ডিম ছোড়ার মুহূর্ত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে সমাজমাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতেও সেই কারণেই ‘ডিম-প্রতিবাদ’ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এমনকি ডিমের চাহিদা ও দামের উপরও এর প্রভাব পড়েছে।
‘ডিম-রাজনীতি’ কি নতুন প্রতিবাদের ভাষা?
পশ্চিমবঙ্গ থেকে কসোভো—দুই জায়গার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল স্পষ্ট। রাজনৈতিক ক্ষোভ যখন প্রচলিত সংসদীয় বা দলীয় প্রতিবাদের সীমা পেরিয়ে প্রকাশ্য অপমানের প্রতীকে পরিণত হয়, তখন ডিম হয়ে উঠছে সেই প্রতিবাদের হাতিয়ার। বাংলায় ভোটের পর তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে একের পর এক ডিম ছোড়ার ঘটনা এবং তার পরেই কসোভোর সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে লক্ষ্য করে ডিম—দুটি ঘটনা তাই একই প্রশ্ন সামনে আনছে।
রাজনীতিতে মতবিরোধ থাকবে, প্রতিবাদও থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যখন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে অপমান বা আক্রমণের রূপ নেয়, তখন প্রশ্ন ওঠে রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও। বাংলায় ভোটের পর যে ‘ডিম-রাজনীতি’ নিয়ে এত আলোচনা, এ বার তারই মতো একটি দৃশ্য দেখা গেল বিদেশের সংসদে। জায়গা বদলেছে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে—কিন্তু প্রতিবাদের অস্ত্র সেই ডিমই।