হাবিবুর রহমান, ঢাকা : দীর্ঘ দুই মাসের প্রতিকূল আবহাওয়া ও বারবার তিন নম্বর সতর্ক সংকেতের ধাক্কা কাটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের কক্সবাজার উপকূলে ফিরেছে ইলিশের জোয়ার। ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশে ভরে উঠছে কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের শেড। একের পর এক মাছভর্তি ট্রলার ঘাটে ভিড়ছে, চলছে ব্যস্ত বেচাকেনা। ইলিশের প্রাচুর্যে স্বস্তি ফিরেছে জেলে, ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের মাঝে। একই সঙ্গে বেড়েছে মৎস্য শ্রমিক ও বরফ ব্যবসায়ীদের কর্মচাঞ্চল্য।
বৃহস্পতিবার সকালে কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, শেডজুড়ে রুপালি ইলিশের স্তূপ। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত—যেদিকেই চোখ যায়, দেখা মিলছে ইলিশের সারি। ট্রলার থেকে মাছ নামানোর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হচ্ছে দরদাম ও বেচাকেনা। ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো অবতরণ কেন্দ্র।
জেলেরা জানান, গত দুই মাসে ছয়বার তিন নম্বর সতর্ক সংকেত জারি হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ দিনই ছিল বৈরী আবহাওয়া। ফলে দীর্ঘ সময় সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেননি তারা। এতে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে অনেকটা কষ্টে দিন কাটাতে হয়েছে।
আবহাওয়া কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর প্রায় এক সপ্তাহ আগে আবারও সাগরে পাড়ি জমান কক্সবাজার উপকূলের জেলেরা। এরপর থেকেই একের পর এক মাছভর্তি ট্রলার ফিরতে শুরু করে। সাগরে টানা সাত দিন মাছ শিকার শেষে প্রায় দুই হাজার ইলিশ নিয়ে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আসা মহেশখালীর তাজিয়ারকাটা এলাকার এফবি আল্লাহ দান ট্রলারের মালিক এনাম উদ্দিন ও জেলে গিয়াস উদ্দিনও ব্যস্ত সময় পার করছেন।
জেলে গিয়াস উদ্দিন বলেন, অনেকদিন পর সাগরে গিয়ে জাল ফেলতেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়েছে। মাছ বেশি পাওয়ায় তারা খুবই খুশি। এখন অবতরণ কেন্দ্রে এসে ধরা মাছ বিক্রি করছেন।
এফবি ফাতেমা ট্রলারের জেলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, দুই মাস পর সাগরে আবারও ইলিশের দেখা মিলেছে। মাছের আকার কিছুটা ছোট হলেও ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পাওয়ায় তারা আনন্দিত।
ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় তুলনামূলকভাবে কমেছে দামও। মৎস্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক জানান, ছোট আকারের ১০০টি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬০ হাজার টাকায়। মাঝারি আকারের ১০০টি ইলিশের দাম প্রায় ৯০ হাজার টাকা এবং বড় আকারের ১০০টি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। আগের তুলনায় ইলিশের দাম কিছুটা কমেছে বলেও জানান তিনি।
ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় বেড়েছে বরফের চাহিদাও। বরফ ব্যবসায়ী করিম সিকদার বলেন, আগে যেখানে এক হাজার টাকার বরফও বিক্রি হতো না, সেখানে গত দুই দিনে ১০ হাজার টাকার বেশি বরফ বিক্রি করেছেন। মাছের সরবরাহ বাড়ায় তাদের ব্যবসায়ও প্রাণ ফিরেছে।
মৎস্য শ্রমিক আসাদ বলেন, ইলিশে অবতরণ কেন্দ্র সয়লাব হওয়ায় কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে, বেড়েছে আয়ও। গত দুই মাসে দিনে ১০০ থেকে ২০০ টাকা আয় করে সংসার চালাতে কষ্ট হয়েছে। এখন ইলিশ আসায় দিনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা আয় করছেন। এতে শ্রমিকদের সংসারেও স্বস্তি ফিরেছে।
এদিকে ইলিশের এই জোয়ার দীর্ঘস্থায়ী করতে সাগরে অবৈধ কাঠের ট্রলিং বন্ধের দাবি জানিয়েছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা। তাদের অভিযোগ, অবৈধ কাঠের ট্রলিংয়ের কারণে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি আবদুর রহমান বলেন, সাগরে অবৈধ কাঠের ট্রলিং বেড়েছে। এসব নৌযানের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অভিযান চালানো প্রয়োজন। অবৈধ ট্রলিং বন্ধ করা গেলে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার আরও বাড়বে।
একই সঙ্গে ৫৮ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবতার আলোকে পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন ট্রলার মালিকরা। ট্রলার মালিক আবদুর রহমান বলেন, অনেকদিন পর সাগরে ইলিশের দেখা মিলেছে। বর্ষা মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে একদিকে মাছের প্রজনন রক্ষা হবে, অন্যদিকে জেলে-ট্রলার মালিকরাও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচবেন।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক আশীষ কুমার বৈদ্য বলেন, গত এক সপ্তাহে কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ১৫০ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ এসেছে। এর মধ্যে শুধু গত দুই দিনেই এসেছে ৫০ মেট্রিক টন ইলিশ।
দীর্ঘ প্রতিকূল আবহাওয়ার পর সাগরে ইলিশের এমন প্রাচুর্যে প্রাণ ফিরেছে কক্সবাজারের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। জেলে, ট্রলার মালিক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও বরফ ব্যবসায়ী—সবার প্রত্যাশা, ইলিশের এই জোয়ার অব্যাহত থাকবে এবং সাগরনির্ভর মানুষের জীবনে আরও স্বস্তি ফিরবে।