নয়াদিল্লি: ‘ভোট চুরি’র অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দিল্লির রামলীলা ময়দানে শক্তি প্রদর্শনের ডাক দিয়েছিল বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। সভায় হাজির ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, রাহুল গান্ধী, সনিয়া গান্ধী, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব-সহ একাধিক বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা। কিন্তু সভা শেষ হওয়ার আগেই বিরোধীদের জমায়েত নিয়ে প্রশ্ন তুলল বিজেপি।
তাদের দাবি, ১০ লক্ষ মানুষের সমাগমের কথা বলা হলেও রামলীলা ময়দানের প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গাই ফাঁকা ছিল। এই সভাকে ‘সুপার ফ্লপ’ বলে কটাক্ষ করে গেরুয়া শিবির। পাল্টা মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিলেন রাহুল। তাঁর দাবি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পর এ বার আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে মোদী ও শাহকেও।
রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে ‘চলো দিল্লি’ কর্মসূচির আয়োজন করেছিল ২১টি বিরোধী দলের জোট। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করে তারা। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে পরিকল্পিত ভাবে বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। এই অভিযোগেই শনিবার প্রতীকী ‘গণ-ইমপিচমেন্ট’ কর্মসূচিও পালন করে বিরোধী জোট। রবিবারের সভা ছিল সেই আন্দোলনের পরবর্তী পদক্ষেপ।
‘কোথায় ১০ লক্ষ মানুষ?’ প্রশ্ন বিজেপির
সভায় লোকসমাগম নিয়ে প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল বিজেপি। দলের সাংসদ সম্বিত পাত্র দাবি করেন, রামলীলা ময়দানের প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গা ফাঁকা ছিল। তাঁর কথায়, “রাহুল গান্ধী বক্তৃতা করছেন, আর পিছনে ফাঁকা চেয়ার দেখা যাচ্ছে। ৫০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার ময়দানও ভরাতে পারল না কংগ্রেস। এই সভা পুরোপুরি সুপার ফ্লপ।”
বিরোধীদের ১০ লক্ষ মানুষের জমায়েতের দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সম্বিতের কটাক্ষ, এতগুলি দল, এতগুলি পতাকা একত্রিত করেও যদি ১০ লক্ষ মানুষকে জড়ো করা না যায়, তা হলে সেই সভাকে কী ভাবে জনসমর্থনের প্রমাণ বলা হবে? তাঁর অভিযোগ, ক্যামেরার বিশেষ কোণ ব্যবহার করে জমায়েতকে বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে সম্বিত বলেন, “ভারত কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এই দেশ ভারতীয়দের। এখানে চা বিক্রেতাও প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।” প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য পরিশ্রম ও ঘাম ঝরাতে হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘জ্ঞানেশের পর আপনারা’, মোদী-শাহকে হুঁশিয়ারি রাহুলের
বিজেপির আক্রমণের মধ্যেই রামলীলা ময়দানের সভা থেকে পাল্টা সুর চড়ান রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, একাধিক রাজ্যে নির্বাচনে কারচুপি করে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ছত্তীসগঢ়, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটক-সহ ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ভোট চুরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ইভিএমের পাশাপাশি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন নাম সংযোজনের মাধ্যমেও কারচুপি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
রাহুলের কথায়, “অমিত শাহ বলেছেন, নরেন্দ্র মোদী কোথাও যাচ্ছেন না। আমি উল্টো কথা বলছি। নরেন্দ্র মোদী কোথাও যেতে পারবেন না। তিনি যেতে চাইলেও আমরা তাঁকে যেতে দেব না। জ্ঞানেশ কুমারের পর আমরা আপনাদের সামনে দাঁড়াব। তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।”
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধেও তীব্র আক্রমণ শানান লোকসভার বিরোধী দলনেতা। তাঁর দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরানো হবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাহুলের বক্তব্য, গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার লড়াইয়ে বিরোধীরা পিছিয়ে আসবে না। দেশের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা যেন মাত্র কয়েক জনের হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই দাবিও তোলেন তিনি।
মমতার নিশানায় জ্ঞানেশ, ‘পরিবর্তন’ নিয়ে আশাবাদী অখিলেশ
সভায় উপস্থিত বিরোধী নেতারাও নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, এসআইআর-এর জেরে বাংলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে তাঁর কটাক্ষ, “জ্ঞানেশ, কবে ভ্যানিশ হবে?” তাঁর অভিযোগ, ভোট চুরির মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধানকে আঘাত করা হচ্ছে।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব রামলীলা ময়দানকে ‘গণতন্ত্রের হলদিঘাট’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, সভায় মানুষের উপস্থিতি এবং স্লোগানই প্রমাণ করছে, রাজনৈতিক পরিবর্তন যে কোনও সময় আসতে পারে। ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপি ও তার শরিকদের বিদায়ের বার্তা দেন তিনি।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের অভিযোগ, ভোট চুরি করেই বিজেপি একাধিক রাজ্যে সরকার গড়েছে। মোদী ও শাহের বিরুদ্ধে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত বিরোধীদের আন্দোলন থামবে না। কেন্দ্রীয় সংস্থার ভয় দেখিয়েও বিরোধীদের দমানো যাবে না বলে দাবি করেন তিনি।
সভা ঘিরে পাল্টা রাজনৈতিক সংঘাত
রামলীলা ময়দানের সভা ঘিরে শুধু জমায়েতের হিসাব নয়, বিতর্ক তৈরি হয়েছে দিনক্ষণ নিয়েও। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার বর্ষপূর্তির দিনে এই কর্মসূচি আয়োজন করায় কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছে বিজেপি। তাদের অভিযোগ, এমন একটি সংবেদনশীল দিনে সভা করে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের আবেগে আঘাত করা হয়েছে। পাশাপাশি দিল্লির ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কাও তুলে ধরেছে গেরুয়া শিবির।
অন্য দিকে, রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, দিল্লির কনট প্লেস-সহ একাধিক এলাকায় বিজেপি জোর করে দোকান বন্ধ করিয়েছে। তাঁর দাবি, বিরোধীদের কর্মসূচির জন্য ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হলেও দোকান বন্ধ রাখার জন্য দায়ী বিজেপিই।
সব মিলিয়ে, ‘ভোট চুরি’ ইস্যুতে বিরোধীদের দিল্লির সভা নতুন করে জাতীয় রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়াল। এক দিকে বিজেপির ‘সুপার ফ্লপ’ তকমা, অন্য দিকে মোদী-শাহের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি রাহুলের। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ এবং শাসক শিবিরের পাল্টা আক্রমণে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হল।




