কলকাতা: রাজ্যে গত ১৫ বছরে বিভিন্ন সরকারি দফতরে হওয়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তলব করল নবান্ন। কোন দফতরে কত কর্মীকে চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ করা হয়েছে, কী পদ্ধতিতে তাঁদের নিয়োগ হয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় সরকারি নিয়ম ও নির্দেশিকা মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে উদ্যোগী হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রাথমিকভাবে চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ ডি কর্মীদের নিয়োগের নথি যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ৬ নভেম্বরের মধ্যে নির্দিষ্ট ছকে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন দফতরকে।
প্রশাসন সূত্রে খবর, সেচ ও জলসম্পদ দফতর ইতিমধ্যেই রাজ্যের সমস্ত সার্কেলের সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ারদের চিঠি পাঠিয়ে নিয়োগ সংক্রান্ত বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর জারি হওয়া অর্থ দফতরের নির্দেশিকা মেনে নিয়োগ হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। ওই নির্দেশিকার ৯, ১১ এবং ১৪ নম্বর ধারার বিধান যথাযথ ভাবে মানা হয়েছিল কি না, তারও নথি চাওয়া হয়েছে। কর্মীদের নিয়োগের বিবরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পাশাপাশি কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে কি না, সেই তথ্যও জমা দিতে বলা হয়েছে।
শুধু সেচ দফতর নয়, রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতরে চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ ডি কর্মীদের নিয়োগের তথ্যও একত্রিত করতে চাইছে নবান্ন। গত দেড় দশকে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের পরিমাণ কী ভাবে বেড়েছে, সেই ছবিও সামনে আনতে চাইছে প্রশাসন। ২০১৪ সালে রাজ্যে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় লক্ষ। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রাম পুলিশ ও গ্রিন পুলিশের মোট সংখ্যা ছিল ১ লক্ষ ১৫ হাজারের বেশি। ওই বছরের রাজ্য বাজেটে চুক্তিভিত্তিক গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যে সব মিলিয়ে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজ্য প্রশাসনের একাংশের অভিযোগ, গত ১৫ বছরে স্থায়ী শূন্যপদে নিয়মিত নিয়োগের পরিবর্তে বিভিন্ন দফতরে বিপুল সংখ্যায় অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগের স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি। তবে বর্তমান তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া থেকে এখনও কোনও নির্দিষ্ট নিয়োগকে অনিয়মিত বা বেআইনি বলে চিহ্নিত করা হয়নি। নথি খতিয়ে দেখার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অল বেঙ্গল কনট্র্যাকচুয়াল এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা মনোজ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, বছরের পর বছর ধরে চুক্তিভিত্তিক কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। অথচ সরকারি দফতরে গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি-সহ বহু স্থায়ী পদ খালি পড়ে রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, স্থায়ী পদের বিকল্প হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের উপর নির্ভরতা বাড়ায় এক দিকে সরকারের রাজস্বের উপর চাপ তৈরি হয়েছে, অন্য দিকে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মনোজের বক্তব্য, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের অনেকেরই পেনশন বা অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে দীর্ঘদিন কাজ করার পরেও তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থেকে যাচ্ছে। নতুন সরকারের কাছে তাঁর আবেদন, যাঁরা যোগ্য এবং দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, তাঁদের স্থায়ী করার বিষয়টি বিবেচনা করা হোক। যোগ্যতা থাকলে গ্রুপ ডি কর্মীদের গ্রুপ সি পদে উন্নীত করার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, রাজ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পদ্ধতি ও পরিসর নিয়ে বড়সড় প্রশাসনিক পর্যালোচনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে গ্রুপ ডি কর্মীদের নিয়োগের নথি যাচাই হলেও পরবর্তী সময়ে এই পর্যালোচনার পরিধি কতটা বাড়ে, তা নিয়ে নজর রয়েছে প্রশাসনিক মহলের। তবে এই উদ্যোগে শুধু নিয়োগের অনিয়ম খুঁজে বের করাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করা কর্মীদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




