নয়াদিল্লি: চিন থেকে ভারতে পণ্য আসে বিপুল পরিমাণে। মোবাইল থেকে ইলেকট্রনিক্স, যন্ত্রাংশ থেকে শিল্পসামগ্রী—দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের বাণিজ্যের ভারটা এক দিকে হেলে। কিন্তু এ বার সেই ছবির একটি অংশে বদলের ইঙ্গিত। চিনের বাজারে বাড়ছে ভারতে তৈরি ইলেকট্রনিক্স পণ্যের চাহিদা। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম 5 মাসে, অর্থাৎ এপ্রিল থেকে আগস্টে, চিনে ভারতের রফতানি বেড়েছে প্রায় 40%। আর এই বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি ইলেকট্রনিক্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য।
চমকটা আরও বড় কারণ, যে দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন কেন্দ্র, সেই চিনেই এখন ভারতের তৈরি কিছু ইলেকট্রনিক্স পণ্য ঢুকছে বাড়তি হারে। সরকারি তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত অর্থবর্ষে চিনে ভারতের রফতানি প্রায় তিন গুণ বেড়ে $3.18 billion হয়েছিল। সেই বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল printed circuit board assemblies, smartphone, display module এবং telecom equipment-এর মতো পণ্যের।
এ বার চলতি অর্থবর্ষেও সেই গতি পুরোপুরি থামেনি। এপ্রিল-আগস্টে ভারতের ইলেকট্রনিক্স রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় 15%-এরও বেশি বেড়েছে। শিল্পমহলের মতে, এর পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে বিশ্ব জুড়ে AI-নির্ভর প্রযুক্তি এবং data centre তৈরির বিস্ফোরক চাহিদার। AI-র জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চক্ষমতার যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স সরবরাহের চাপ বাড়ায় ভারতীয় উৎপাদকদের কাছেও নতুন বাজার খুলছে।
Electronic Industries Association of India-র secretary general Rajoo Goel-এর বক্তব্য, AI-ভিত্তিক পণ্য এবং দ্রুত বাড়তে থাকা data centre-এর জন্য উচ্চমানের যন্ত্রপাতির চাহিদা তৈরি হয়েছে। সেই চাহিদা মেটাতে সরবরাহকারীদের উপর চাপ বাড়ছে এবং তার একটি অংশ ভারতের ইলেকট্রনিক্স রফতানির দিকে যাচ্ছে। অর্থাৎ, AI-র দৌড় শুধু সফটওয়্যার বা data centre-এর বাজার বদলাচ্ছে না, তার প্রভাব পড়ছে hardware manufacturing এবং supply chain-এর উপরেও।
ভারতের জন্য এই প্রবণতার গুরুত্ব এখানেই। এত দিন ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ মানে শুধু দেশের বাজারে তৈরি পণ্য নয়, আন্তর্জাতিক supply chain-এ ভারত কতটা জায়গা করে নিতে পারছে, সেটিও বড় প্রশ্ন ছিল। চিনের মতো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ সেই জায়গায় একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
Indian Cellular and Electronics Association-এর chairman Pankaj Mohindroo-র মতে, এই বৃদ্ধির অর্থ ভারতীয় উৎপাদন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক global value chain-এ বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে শুরু করেছে। তবে এই বৃদ্ধি এখনও ছোট ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে—তাই এটিকে রাতারাতি বড় পরিবর্তন বলে দেখার সুযোগ নেই।
তথ্যেও সেই সতর্কতার কারণ রয়েছে। চিন এখনও ভারতের পণ্যের জন্য তুলনামূলক ভাবে ছোট বাজার। গত অর্থবর্ষে ভারতের মোট রফতানির মাত্র 4.4% গিয়েছিল চিনে। তার আগের বছরে এই হার ছিল 3%-এর সামান্য বেশি। অন্য দিকে ভারতের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার আমেরিকা, যেখানে ভারতের মোট রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। অর্থাৎ, চিনে ভারতের ইলেকট্রনিক্স রফতানি বাড়লেও সামগ্রিক বাণিজ্য ছবিতে এখনও বিরাট ফারাক। গত অর্থবর্ষে ভারত চিন থেকে আমদানি করেছে $131.6 billion-এর পণ্য। ভারতের মোট আমদানির প্রায় 17% এসেছে চিন থেকে। তার তুলনায় চিনে ভারতের রফতানির অঙ্ক এখনও অনেকটাই কম। ফলে রফতানি বৃদ্ধির এই প্রবণতা বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ভারতীয় তথ্য অনুযায়ী printed circuit board-এর মতো পণ্যের রফতানি বৃদ্ধির কথা সামনে এলেও চিনের customs data-তে একই মাত্রার PCB আমদানির বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। বরং চিনের হিসাবের বড় অংশ smartphone এবং অন্যান্য telecom products-এর আওতায় এসেছে। দুই দেশের পণ্য শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্যের কারণে ঠিক কোন পণ্যের কতটা বৃদ্ধি হয়েছে, তা নির্দিষ্ট ভাবে মেলানো কঠিন বলেই শিল্পমহলের বক্তব্য।
তবে শুধু ইলেকট্রনিক্স নয়, অন্য শিল্পপণ্যেও ভারতের রফতানি বাড়ছে। এপ্রিল-আগস্টে চিনে ভারতের engineering exports প্রায় 21% বেড়েছে বলে রফতানিকারকদের তথ্য। machinery এবং machinery parts, auto components এবং hand tools-এর মতো পণ্যেও এই বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ ছবিটা শুধু মোবাইল বা ইলেকট্রনিক্সের মধ্যে আটকে নেই; ধীরে ধীরে তৈরি পণ্যের আরও কয়েকটি ক্ষেত্রেও ভারতীয় সংস্থাগুলি চিনের বাজারে জায়গা করার চেষ্টা করছে।
এর সঙ্গে বদলাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবেশও। ভারত ও চিন সাম্প্রতিক বছরগুলির টানাপড়েনের পর অর্থনৈতিক সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে। একই সময়ে আমেরিকার শুল্কনীতি ও বিশ্ব বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি দুই দেশের কাছেই নতুন সমীকরণের প্রয়োজন তৈরি করেছে। এই পরিবেশে ভারতীয় পণ্যের জন্য চিনের বাজার কিছুটা বেশি উন্মুক্ত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে শিল্পমহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সেটিকে এখনও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা হিসেবে নিশ্চিত করে দেখার মতো সময় হয়নি।
আর এখানেই ভারতের সামনে পরবর্তী বড় পরীক্ষা। শুধু smartphone বা কয়েকটি finished product চিনে পাঠালেই হবে না। ভারতীয় শিল্পকে component, sub-assembly এবং আরও উন্নত প্রযুক্তির পণ্যের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব design capability এবং component manufacturing শক্তিশালী করতে হবে। শিল্পমহলের বক্তব্যও সেই দিকেই—বর্তমান রফতানি বৃদ্ধিকে ধরে রেখে supply chain-এর আরও গভীরে ঢুকতে হবে। অর্থাৎ, গল্পটা শুধু ‘চিনে মেড ইন ইন্ডিয়া’ পৌঁছনোর নয়। আসল লড়াই আরও বড়—বিশ্বের প্রযুক্তি-নির্ভর supply chain-এ ভারত কতটা স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে। AI এবং data centre-এর চাহিদা সেই সুযোগ তৈরি করেছে। ভারত সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে, তার উত্তর মিলবে আগামী কয়েক বছরে।
চিন থেকে এখনও ভারতে $131.6 billion-এর পণ্য আসে, রফতানির অঙ্ক তার ধারেকাছেও নয়। কিন্তু সেই বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির মধ্যেই ভারতের তৈরি ইলেকট্রনিক্সের চিনে প্রবেশ বাড়ছে। ছোট অঙ্ক থেকে শুরু হলেও বার্তাটা তাই গুরুত্বপূর্ণ—একদা যে দেশ থেকে ভারত ইলেকট্রনিক্সের বিপুল জোগান নিত, সেই চিনের বাজারেই এখন ভারতীয় উৎপাদনের জন্য নতুন দরজা খোলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।