কলকাতা: সময় বদলেছে, বদলেছে শহরের চেহারা, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। উত্তর কলকাতার অলিগলিতে আধুনিকতার ছোঁয়া যতই লাগুক না কেন, কিছু ঐতিহ্য আজও বেঁচে রয়েছে একই নিষ্ঠায়। দুর্গাপুজোর সেই পুরনো রীতিনীতির টানেই আজও ফিরে আসে বনেদি বাড়ির পুজোর গল্প। তেমনই এক ঐতিহ্যের সাক্ষী জোড়াসাঁকোর শিকদারপাড়া মল্লিকবাড়ি। ১৮৬৬ সালে শুরু হওয়া এই পারিবারিক দুর্গাপুজো ঘিরে রয়েছে একাধিক প্রাচীন রীতি। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দশমীর দিন দেবীবরণের পর পরিবারের বিবাহিত মহিলাদের নথ খোলার প্রথা। প্রায় ১৬০ বছরের ইতিহাস পেরিয়েও এই রীতি যেন ধরে রেখেছে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক নিবিড় যোগসূত্র।
১৮৬৬ থেকে আজ, ঐতিহ্যের দীর্ঘ পথচলা
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই শুধুমাত্র দেবী আরাধনা নয়, বরং পরিবারের ইতিহাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সংস্কারের এক জীবন্ত দলিল। উনিশ শতকে শুরু হওয়া বহু পারিবারিক পুজো আজও পুরনো রীতিনীতি মেনে উদ্যাপিত হয়। শিকদারপাড়া মল্লিকবাড়ির পুজোও সেই ঐতিহ্যের ধারক।
১৮৬৬ সালে যে পুজোর সূচনা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবারের স্মৃতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু পুজোকে ঘিরে আবেগ এবং রীতির গুরুত্ব আজও অটুট। বনেদি বাড়ির পুজোর বিশেষত্ব এখানেই এখানে প্রতিটি আচার কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, অনেক সময় তা পরিবারের অতীতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক একটি গল্প।
দশমীর নথ খোলার রীতি, কী তার তাৎপর্য?
দুর্গাপুজোর দশমী মানেই দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি। সিঁদুরখেলা, দেবীবরণ এবং বিসর্জনের আবহে মেতে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু শিকদারপাড়া মল্লিকবাড়িতে এই পরিচিত পর্বের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এক বিশেষ পারিবারিক রীতি।
প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, দশমীর দিন দেবীবরণের পর পরিবারের বিবাহিত মহিলারা পাঁচ-কড়াই খেয়ে তাঁদের নথ খোলেন। এই আচার পুজোর সমাপ্তি পর্বকে দেয় নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। বাইরে থেকে দেখলে এটি হয়তো একটি ছোট্ট পারিবারিক রীতি, কিন্তু পরিবারের কাছে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ, এমন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, পারিবারিক পরিচয় এবং প্রজন্মান্তরে চলে আসা সংস্কার।
বনেদি বাড়ির পুজোয় অনেক সময় এমন কিছু রীতি দেখা যায়, যা বৃহত্তর উৎসবের ভিড়ে আড়ালে থেকে যায়। অথচ সেই আচারগুলিই একটি পরিবারের পুজোকে অন্যদের থেকে আলাদা করে চেনায়।
বিসর্জনের আগে আবেগের অন্য নাম
দশমী বাঙালির কাছে আনন্দ ও বিষাদের মিশ্র অনুভূতি। কয়েক দিনের উৎসব শেষে যখন দেবীকে বিদায় জানানোর সময় আসে, তখন বাড়ির সদস্যদের মনে ভিড় করে নানা স্মৃতি। সেই আবেগের মধ্যেই পালিত হয় পরিবারের নির্দিষ্ট রীতিনীতি। শিকদারপাড়া মল্লিকবাড়ির নথ খোলার প্রথাও সেই বিদায়বেলার বিশেষ মুহূর্তের অংশ।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল সময়ে অনেক পুরনো রীতিই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পারিবারিক পুজোর মধ্য দিয়ে কিছু ঐতিহ্য এখনও টিকে রয়েছে। প্রবীণদের কাছ থেকে ছোটদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে সেই আচার, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি এবং পরিবারের নিজস্ব ইতিহাস।
বনেদি বাড়ির পুজো মানেই ইতিহাসের জানলা
কলকাতার দুর্গাপুজো নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত বড় মণ্ডপ, অভিনব থিম কিংবা দর্শনার্থীদের ভিড়ের কথাই সামনে আসে। কিন্তু শহরের বনেদি বাড়ির পুজোগুলিও কলকাতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে উৎসবের জৌলুসের চেয়ে অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায় ধারাবাহিকতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের সংরক্ষণ।
জোড়াসাঁকোর শিকদারপাড়া মল্লিকবাড়ির পুজো সেই ঐতিহ্যেরই একটি উদাহরণ। ১৮৬৬ সাল থেকে চলে আসা এই পুজো এবং দশমীর নথ খোলার বিশেষ রীতি মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজো শুধু দেবী আরাধনার কয়েকটি দিনের উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু প্রজন্মের স্মৃতি, বিশ্বাস এবং একান্ত নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়।
সব মিলিয়ে, শিকদারপাড়া মল্লিকবাড়ির এই প্রাচীন রীতি আজও কৌতূহল জাগায়। কারণ, আধুনিকতার প্রবল স্রোতেও ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে রাখার মধ্যেই রয়েছে বনেদি বাড়ির পুজোর স্বাতন্ত্র্য। বিসর্জনের আগে নথ খোলার সেই মুহূর্ত তাই কেবল একটি আচার নয়, বরং সময়ের বুক চিরে আজও বেঁচে থাকা এক পারিবারিক ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।





