স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও শেষ হয়নি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ঘিরে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা। এ বার সেই প্রতীক্ষার অবসানের দাবিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলেন তাঁর কন্যা অনিতা বোস ফাফ। জাপানের টোকিয়োর রেনকোজি মন্দিরে সংরক্ষিত নেতাজির দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার আর্জি জানিয়ে করা মামলায় মঙ্গলবার কেন্দ্রকে নোটিস দিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে উঠেছিল মামলাটি। নেতাজির কন্যার হয়ে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি।
এ দিনের আদালত-পর্ব আসলে একটি দীর্ঘ আইনি ও ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার নতুন অধ্যায়। চলতি বছরের মার্চে নেতাজির ভাইপো অশিস রায় একই দাবি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। বেঞ্চ জানিয়েছিল, নেতাজির একমাত্র জীবিত সরাসরি উত্তরাধিকারী তাঁর কন্যা অনিতা ফাফ নিজে আবেদন করলে বিষয়টি যথাযথ ভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেই পরামর্শের পরেই এ বার সরাসরি শীর্ষ আদালতে এলেন অনিতা।
টোকিয়োর মন্দিরে আট দশক ধরে অপেক্ষা
রেনকোজি মন্দিরের নামটি নেতাজির মৃত্যুর বিতর্কের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িয়ে। প্রচলিত ঐতিহাসিক বয়ান অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৮ অগস্ট তাইহোকু—বর্তমান তাইপেই—বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়। তাঁর দেহদাহের পর যে চিতাভস্ম সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা পরে জাপানের টোকিয়োর রেনকোজি মন্দিরে রাখা হয় বলে দাবি। সেই ভস্মই নেতাজির দেহাবশেষ বলে ভারতীয় সরকারের বিভিন্ন পদস্থ ব্যক্তি এবং নেতাজির পরিবারের একাংশ দীর্ঘদিন ধরে মেনে এসেছে।
তবে নেতাজির মৃত্যু এবং রেনকোজিতে রাখা ভস্মের পরিচয় নিয়ে বহু দশক ধরে প্রশ্ন ও বিতর্কও চলে আসছে। এই কারণেই অনিতার আবেদন নিছক একটি পারিবারিক আবেগের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বৃহৎ কিংবদন্তির শেষ অধ্যায় কী ভাবে লেখা হবে, সেই প্রশ্নও।
কী চাইছেন নেতাজির কন্যা?
সুপ্রিম কোর্টে করা আবেদনে অনিতা একাধিক নির্দেশ চেয়েছেন। প্রথমত, রেনকোজি মন্দিরে রাখা নেতাজির বলে চিহ্নিত চিতাভস্মের urn বা আধারটি যাতে সংরক্ষিত থাকে এবং তার বর্তমান অবস্থা অপরিবর্তিত রাখা হয়, সে বিষয়ে জাপানের সঙ্গে সরকারি স্তরে যোগাযোগের দাবি জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, গোটা বিষয়টি এগিয়ে নিতে একটি আন্তঃমন্ত্রক কমিটি তৈরির আর্জি জানিয়েছেন তিনি। বিদেশ মন্ত্রক-সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরগুলিকে নিয়ে সেই কমিটি তৈরি করে দেহাবশেষ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তৃতীয়ত, আবেদনকারীর দাবি, সরকার যেন দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনা বা সেই প্রক্রিয়ায় তাঁকে সহায়তা করার জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা আদালতে পেশ করে। অর্থাৎ বিষয়টি যেন আর অনির্দিষ্ট সময় ধরে সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থাকে।
কেন এত দিনেও দেশে ফেরেনি?
প্রশ্নটি নতুন নয়। নেতাজির অন্তর্ধানের পর থেকেই তাঁর পরিণতি নিয়ে নানা মত সামনে এসেছে। ১৯৫৬ সালের শাহনওয়াজ কমিটি, ১৯৭০ সালের খোসলা কমিশন এবং পরে ১৯৯৯ সালে গঠিত মুখার্জি কমিশন—নেতাজির অন্তর্ধান ও মৃত্যুর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য একাধিক তদন্ত হয়েছে।
মুখার্জি কমিশন অবশ্য তাইহোক বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর প্রচলিত তত্ত্বের সঙ্গে একমত হয়নি এবং রেনকোজি মন্দিরের ভস্মকে নেতাজির বলে নিশ্চিত ভাবেও গ্রহণ করেনি। পরবর্তী সময়ে ভারত সরকার ওই কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। ফলে সরকারি ভাবে এক দিকে বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বয়ান বহাল থেকেছে, অন্য দিকে নেতাজির দেহাবশেষের পরিচয় নিয়ে বিতর্কও পুরোপুরি মুছে যায়নি। এই দ্বৈত বাস্তবতাই বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে।
অনিতার বক্তব্যে আবেগের সঙ্গে দাবি
নেতাজির কন্যা দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর বাবার চিতাভস্ম ভারতে ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। চলতি বছরের শুরুতেও তিনি আবেদন করেছিলেন, আজকের ভারত যেন তাঁর বাবাকে ‘শেষ বার দেশে ফেরার’ সুযোগ দেয়। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর—নেতাজির দেহাবশেষ যদি রেনকোজিতে সংরক্ষিত থেকে থাকে, তবে তা তাঁর নিজের দেশেই থাকা উচিত এবং পরিবারের তরফে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সুযোগ পাওয়া উচিত।
এই দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই টোকিয়োর রেনকোজি মন্দিরে গিয়ে ওই ভস্মাধারে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। নেতাজির পরিবারের তরফে বলা হয়েছে, এত বছর ধরে ভারতীয় রাষ্ট্র যদি ওই দেহাবশেষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকে, তবে এখন সেটিকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিষয়টির একটি চূড়ান্ত পরিণতি দেওয়া প্রয়োজন।
মার্চে আদালতে উঠেছিল একই প্রশ্ন
এ বছরের মার্চে অশিস রায়ের আবেদনের শুনানিতে বিষয়টি ফের জাতীয় আলোচনায় আসে। আদালত তখন স্পষ্ট করে দিয়েছিল, নেতাজির পরিবারের সরাসরি উত্তরাধিকারী নিজে আবেদন করলে বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পেতে পারে। সেই আবেদন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তার কয়েক মাসের মধ্যেই অনিতা ফাফের নতুন আবেদন।
ফলে এ দিনের নোটিসকে শুধু একটি মামলার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে দেখলে ভুল হবে। নেতাজির দেহাবশেষ দেশে ফেরানোর দাবি এ বার তাঁর নিজের কন্যার আবেদনের মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারাধীন হয়েছে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। সুপ্রিম কোর্ট এ দিন দেহাবশেষ দেশে ফেরানোর নির্দেশ দেয়নি। আদালত কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে।
অর্থাৎ এখনই বলা যাচ্ছে না যে রেনকোজি মন্দিরে রাখা ভস্মকে আদালত নেতাজির দেহাবশেষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আপাতত প্রশ্নটি হল—ভারত সরকার এই দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কী পদক্ষেপ করেছে বা করবে, এবং সেই প্রক্রিয়া কী ভাবে এগোনো সম্ভব। প্রায় ৮১ বছর ধরে যে প্রশ্নটি ইতিহাসের অন্ধকারে আটকে আছে, তার উত্তর খোঁজার পথ এ বার আদালতের দরজায়।
নেতাজির কন্যার আবেদন সেই প্রশ্নকে আবার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—যদি রেনকোজির সেই ভস্মই হয় আজাদ হিন্দের নেতার শেষ চিহ্ন, তবে আর কত দিন তিনি থাকবেন বিদেশের মাটিতে? সুপ্রিম কোর্টের নোটিসের পরে এখন নজর কেন্দ্রের জবাবের দিকে। সেই জবাবেই স্পষ্ট হতে পারে, ইতিহাসের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ অধ্যায় আদৌ শুরু হল কি না।