নিউজ ডেস্ক: রাজ্য পুলিশের নতুন এফআইআর নিয়ে তীব্র ভর্ৎসনা হাইকোর্টের,গোটা তদন্তের ভার গেল সিবিআইয়ের কোর্টেই।
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘিরে রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ফের কড়া অবস্থান নিল কলকাতা হাইকোর্ট। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা যখন ইতিমধ্যেই শীর্ষ আদালতের নির্দেশে এই ঘটনার সার্বিক তদন্ত চালাচ্ছে, তখন সেই একই কাণ্ডে রাজ্য পুলিশ কেন পৃথক এফআইআর রুজু করল সেই প্রশ্নে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল আদালত।
বিচারপতি শম্পা সরকারের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, পুলিশের দায়ের করা মামলার যাবতীয় তদন্তভারও যাবে সিবিআইয়ের হাতেই। সমান্তরাল কোনও তদন্ত পুলিশ করতে পারবে না।
এ দিন শুনানিপর্বে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্য পুলিশের এই পদক্ষেপের আইনি যৌক্তিকতা নিয়ে সোজাসুজি প্রশ্ন তোলে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ,যেখানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই স্পর্শকাতর মামলার ওপর কলকাতা হাইকোর্ট সরাসরি নজরদারি চালাচ্ছে এবং তদন্তের গুরুদায়িত্ব কেন্দ্রীয় সংস্থার কাঁধে সঁপে দেওয়া হয়েছে, সেখানে পুলিশের এই অতিসক্রিয়তার উদ্দেশ্য কী? তারা কি জানে না যে সিবিআই ইতিমধ্যেই তদন্ত চালাচ্ছে? ব্যারাকপুর আদালতে থাকা এই সংক্রান্ত যাবতীয় নথি অবিলম্বে শিয়ালদহ বিশেষ আদালতে স্থানান্তরের কড়া নির্দেশ দেয় ডিভিশন বেঞ্চ।
পাল্টা যুক্তি সাজাতে গিয়ে নির্যাতিতার পরিবারের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন,এই ঘটনায় আরও চার জনের জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছিল, যা কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি বলেই পুলিশে নতুন করে এফআইআর দায়ের করতে হয়েছিল। কিন্তু আদালত স্পষ্ট করে দেয়, একই অপরাধ ও মূল ঘটনার জেরে আলাদা করে রাজ্য পুলিশের সমান্তরাল তদন্ত চালানোর কোনও অবকাশ নেই। যা খতিয়ে দেখার, তা মূল তদন্তের অংশ হিসেবে সিবিআই-ই দেখবে।
আদালতের এই টানাপোড়েনের সমান্তরালে গোটা বিষয়টি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা নিয়েছে। নির্যাতিতার মা তথা বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ গোটা ঘটনায় জড়িত প্রত্যেকের চরম শাস্তির দাবিতে ফের সরব হয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তৎকালীন তৃণমূল প্রশাসন ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকার বিরুদ্ধেও।
রত্না দেবনাথের অভিযোগ, “আমাদের মেয়ের ওপর যে নারকীয় অত্যাচার হয়েছে, তা গোটা সমাজ দেখেছে। পাশাপাশি পানিহাটি এলাকাকে কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। পুকুর বুজিয়ে বেআইনি নির্মাণ ও ফ্ল্যাট গড়ার অবাধ কারবার চলেছে।”
তৎকালীন নেতৃত্বের মদতেই অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি করে তিনি বলেন, “প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী চাইলে অনেক আগেই পদক্ষেপ করতে পারতেন, তাঁকে বহুবার বলা সত্ত্বেও তিনি কিছুই করেননি। তবে প্রশাসন সব অপরাধীকে ধরে উপযুক্ত সাজা দেবে, এই ভরসা এখনও আমাদের রয়েছে।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৯ অগাস্ট ভোরে আর জি করের সেমিনার কক্ষ থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিল ওই মহিলা চিকিৎসকের দেহ। সেই সময়ে ময়নাতদন্তের পর গভীর রাতে অস্বাভাবিক তৎপরতায় দেহ সৎকার নিয়ে তৈরি হয়েছিল তুমুল বিতর্ক ও গণবিক্ষোভ। নির্যাতিতার পরিবার শুরু থেকেই অভিযোগ তোলে,তথ্যপ্রমাণ লোপাট ও দ্রুত শেষকৃত্যের নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী তৃণমূল নেতৃত্ব সক্রিয় ছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর খড়দা থানায় সেই রাতের অস্বাভাবিক শেষকৃত্য নিয়ে আলাদা মামলা শুরু হয় এবং পানিহাটির প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল ঘোষ ও প্রাক্তন কাউন্সিলর সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়কে গ্রেফতারও হতে হয়। এবার উচ্চ আদালতের এই নির্দেশে সামগ্রিক তদন্ত প্রক্রিয়াটি ফের পুরোপুরি সিবিআই-এর একক নিয়ন্ত্রণেই ফিরল।
