নিউজ ডেস্ক: শিলিগুড়ি মহকুমা আদালতের এজলাসে এক অভিযুক্তের স্লোগানকে ঘিরে বুধবার তৈরি হল বিতর্ক। আদালতে হাজিরার সময় বিচারক হিজাব পরে থাকায় তাঁকে দেখেই এক অভিযুক্ত ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দেন বলে অভিযোগ। ঘটনাটি ঘটে শিলিগুড়ি মহকুমা আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৪ নম্বর আদালতকক্ষে। যদিও অভিযুক্তের আইনজীবীর দাবি, স্লোগানটি বিচারককে উদ্দেশ্য করে দেওয়া হয়নি। ঘটনার পর আদালতেই ক্ষমা চাওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ২০১৮ সালের মামলাকে কেন্দ্র করে। জানা গিয়েছে, একটি ভিনধর্মী বিয়েকে ঘিরে সেই সময় এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ‘লাভ জিহাদ’-এর অভিযোগ তুলে ত্রিদিপ-সহ কয়েক জন বাঘাযতীন পার্ক এলাকা থেকে মিছিল করে শিলিগুড়ি মহকুমা শাসকের দফতরে স্মারকলিপি দিতে গিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েক জন আগেই জামিন পেয়েছিলেন। বাকি অভিযুক্তদের কয়েক জনের বিরুদ্ধে আদালত থেকে ওয়ারেন্টও জারি হয়েছিল।
বুধবার ওই মামলার সূত্রেই অভিযুক্তদের আদালতে হাজির হতে বলা হয়। নির্দিষ্ট সময়ে তাঁরা শিলিগুড়ি মহকুমা আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৪ নম্বর আদালতে উপস্থিত হন। আদালতের তরফে একে একে অভিযুক্তদের নাম ধরে উপস্থিতি নেওয়া হচ্ছিল। সেই সময় বিচারকের পোশাক লক্ষ্য করে এক অভিযুক্ত ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দেন বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর আদালতকক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অভিযুক্তদের আইনজীবী ত্রিদিপের বক্তব্য, বিষয়টি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। তাঁর দাবি, বিচারককে উদ্দেশ্য করে ওই স্লোগান দেওয়া হয়নি। অনেকেই অভিবাদন জানানোর সময় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্ভাষণ ব্যবহার করেন। নাম ধরে ডাকার সময় অভিযুক্তদের মধ্যে একজন না বুঝেই ওই শব্দবন্ধ বলে ফেলেছেন বলে আইনজীবীর ব্যাখ্যা। তবে ঘটনার জন্য আদালতের মধ্যেই তিনি এবং তাঁর মক্কেলরা ক্ষমা চেয়ে নেন।
আইনজীবীর এই ব্যাখ্যার পরেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক থামেনি। কারণ, আদালতকক্ষকে ধর্মীয় বা রাজনৈতিক স্লোগান থেকে মুক্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ পরিসর হিসেবে রাখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিলিগুড়ি বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উদয়শঙ্কর মালাকার ঘটনাটিকে অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আদালতের ভিতরে এ ধরনের ঘটনা কোনওভাবেই কাম্য নয়। আদালত চাইলে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে মামলাও করতে পারত বলে তিনি জানিয়েছেন।
অল ইন্ডিয়া লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের দার্জিলিং জেলা সম্পাদক দিবাকর রায়ও আদালতের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আদালত ধর্ম, রাজনীতি এবং অন্যান্য বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার জায়গা। সেখানে কোনও ধর্মীয় বা রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়া উচিত নয়।
তবে এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনও স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য সামনে আসেনি। অভিযুক্ত পক্ষও দাবি করেছে, বিচারকের ধর্মীয় পরিচয় বা পোশাককে লক্ষ্য করে স্লোগান দেওয়া হয়নি।
ফলে একটি স্লোগানকে কেন্দ্র করে শিলিগুড়ি আদালতে তৈরি হওয়া এই বিতর্কে এখন মূল প্রশ্ন, এটি নিছক অনিচ্ছাকৃত উচ্চারণ, নাকি আদালতের শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা? ঘটনার প্রেক্ষিতে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর রয়েছে।
