নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: চাকরি আছে, নিয়মিত বেতন আসছে, সংসার চলছে, তাই অবসরের কথা এখনই ভাবার দরকার নেই! ভারতের মধ্যবিত্তের বড় অংশের এই মানসিকতাই ভবিষ্যতে বিপদ ডেকে আনতে পারে। অবসরের পর আয় বন্ধ হয়ে গেলেও খরচ কিন্তু থামবে না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসার খরচ বাড়বে। ফলে কর্মজীবনে পর্যাপ্ত সঞ্চয় ও বিনিয়োগ না করলে অবসরের পরের জীবন আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে। এই আশঙ্কাই সামনে এনেছেন মিরায় অ্যাসেট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিইও স্বরূপ মহান্তি।
‘৩৫ বছরেই বুঝতে হবে, আরও অনেক দিন বাঁচবেন’
মহান্তির সতর্কবার্তা, ৩৫ বছর বয়সের মধ্যেই কর্মজীবনের পাশাপাশি অবসর-পরবর্তী জীবনের আর্থিক পরিকল্পনা শুরু করা উচিত। কারণ চাকরিজীবীর সক্রিয় আয় এক দিন না এক দিন বন্ধ হবেই। তার পর যত দিন বাঁচবেন, সেই সময়টা চালাতে হবে জমিয়ে রাখা অর্থের উপর নির্ভর করেই।
তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, অবসর কোনও দূরের ঘটনা নয়। বরং যত তাড়াতাড়ি অবসরের জন্য বিনিয়োগ শুরু করা যায়, তত বেশি সুবিধা পাওয়া যায় চক্রবৃদ্ধি হারে বিনিয়োগের ফলে। ৩৫ বছর বয়সেও অবশ্য দেরি হয়ে যায়নি। কিন্তু তার পরেও যদি বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়া হয়, ভবিষ্যতে একই লক্ষ্যে পৌঁছতে মাসে অনেক বেশি টাকা সরাতে হতে পারে।
২০-তে যা সম্ভব, ৪০-এ গিয়ে কেন কঠিন?
চক্রবৃদ্ধি হারের শক্তি বোঝাতে মহান্তি একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, কেউ যদি ২০ বছর বয়স থেকে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ শুরু করেন এবং গড়ে ১২ শতাংশ রিটার্ন পান, তা হলে মাসে কয়েক হাজার টাকা বিনিয়োগ করেই বড় অবসর তহবিল তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু একই লক্ষ্য ৪০ বছর বয়সে শুরু করলে মাসিক বিনিয়োগের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। তিনি ১০ কোটি টাকার লক্ষ্য ধরে এই পার্থক্য বোঝান। অর্থাৎ, শুধু কত টাকা বিনিয়োগ করছেন তা নয়, কত বছর ধরে বিনিয়োগ করছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সময় যত কমে, চক্রবৃদ্ধি হারে টাকা বাড়ার সুযোগও তত কমে যায়।
শুধু সঞ্চয় নয়, চিকিৎসার খরচও মাথায় রাখুন
অবসর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আরও একটি বড় ভুলের কথা বলেছেন মহান্তি, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিমা না থাকা। বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসার প্রয়োজন এবং তার খরচ দুই-ই বাড়তে পারে। ফলে অবসরের সঞ্চয় যদি বড় কোনও হাসপাতালে ভর্তি বা দীর্ঘ চিকিৎসার পিছনে চলে যায়, তা হলে গোটা আর্থিক পরিকল্পনাই ধাক্কা খেতে পারে। তাই অবসরের জন্য বিনিয়োগের পাশাপাশি পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যবিমা এবং আলাদা চিকিৎসা-সুরক্ষা তহবিল রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অবসরের পর ২ কোটি টাকাই কি যথেষ্ট?
অবসর-পরবর্তী সময়ে শুধু কত টাকা জমেছে, সেটাই শেষ কথা নয়। সেই টাকা কী হারে খরচ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অবসর-পরিকল্পনাবিদ মিলিন্দ দেওগাঁওকর জানিয়েছেন, মূল্যবৃদ্ধি এবং চিকিৎসা খরচের কথা মাথায় রেখে অনেক অবসরপ্রাপ্তের ক্ষেত্রে বছরে মোট সঞ্চয়ের প্রায় ২.৫-৩.৫ শতাংশের মধ্যে টাকা তোলার পরিকল্পনা তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে।
৩ শতাংশ হারে টাকা তোলার উদাহরণ দিলে, ২ কোটি টাকার তহবিল থেকে বছরে ৬ লক্ষ টাকা অর্থাৎ মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা পাওয়া যায়। ৩ কোটি টাকার ক্ষেত্রে তা দাঁড়ায় বছরে ৯ লক্ষ, অর্থাৎ মাসে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। তবে বাস্তবে কত টাকা প্রয়োজন হবে তা নির্ভর করবে ব্যক্তির বয়স, জীবনযাত্রার খরচ, বিনিয়োগের ধরন, মূল্যবৃদ্ধি, কর এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ব্যয়ের উপর।
চিকিৎসার জন্য আলাদা তহবিলের পরামর্শ
দেওগাঁওকরের মতে, শহরে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ বিবেচনায় অবসরপ্রাপ্ত দম্পতির জন্য মূল অবসর তহবিলের বাইরে প্রায় ৩৫-৫০ লক্ষ টাকার আলাদা স্বাস্থ্য-সুরক্ষা তহবিল রাখার কথা ভাবা যেতে পারে। কারণ অবসরের পর বড় কোনও চিকিৎসা খরচ এলে মূল তহবিল ভাঙতে হলে ভবিষ্যতের নিয়মিত আয়ের উপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, অবসরের পরিকল্পনা মানে শুধু টাকা জমিয়ে যাওয়া নয়। সেই টাকা অবসরের পর কত দিন চলবে, কী ভাবে নিয়মিত আয় তৈরি হবে এবং চিকিৎসার মতো অনিশ্চিত খরচ কী ভাবে সামলানো হবে, সবটাই পরিকল্পনার অংশ।
মহান্তির সতর্কবার্তাটি তাই মূলত সময়ের গুরুত্ব নিয়েই। আজ বেতন আছে বলে আগামী দিনের নিশ্চয়তা ধরে নেওয়া যাবে না। ৩৫ বছর বয়সে অবসর নিয়ে ভাবা শুরু করলে হাতে এখনও যথেষ্ট সময় থাকে। কিন্তু ৪০-৪৫ পেরিয়ে গিয়ে শুরু করলে একই আর্থিক লক্ষ্যে পৌঁছতে অনেক বেশি সঞ্চয় করতে হতে পারে। অবসর আসবেই, প্রশ্ন হল, তার আগে নিজের ভবিষ্যতের জন্য কতটা প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।