তারাপীঠ, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: শ্রাবণের শেষ সোমবার তারা মায়ের দর্শন করতে এসেছিলেন। রাতের অন্ধকারে হোটেলের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন পুণ্যার্থীরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই হঠাৎ হোটেলের নীচের তলা থেকে ধোঁয়া। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভবনে। ঘুম ভাঙতেই চারদিকে শুধু কালো ধোঁয়া আর চিৎকার। প্রাণ বাঁচাতে কেউ দরজা ভেঙে বেরোনোর চেষ্টা করেছেন, কেউ ব্যালকনিতে গিয়ে পাইপ ধরে নীচে নেমেছেন। ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডে এখনও পর্যন্ত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েক জন।
ঘটনার পরেই হোটেলটি সিল করে দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে মালিককে। কিন্তু আগুনের সূত্রপাত কী ভাবে, তার থেকেও বড় হয়ে সামনে আসছে অন্য প্রশ্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি আদৌ ঠিকঠাক ছিল? জরুরি পরিস্থিতিতে বেরোনোর দরজা কেন তালাবন্ধ ছিল? ফায়ার অ্যালার্মই বা কেন বাজল না?
ভোর সাড়ে ৪টেয় আগুন
সোমবার ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ তারাপীঠ থানার কাছেই পুকুরপাড় এলাকায় ‘বিদেশিনী’ নামে ওই বেসরকারি হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখা যায়। হোটেলের কর্মীদের নজরে প্রথম আগুন আসে বলে জানা গিয়েছে। তাঁরা চিৎকার করে আবাসিকদের সতর্ক করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তত ক্ষণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
হোটেলের ভিতরে থাকা ফাইবারের বিভিন্ন সামগ্রীতে আগুন ধরে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই একাধিক তলা ধোঁয়ায় ভরে যায়। সেই সময় অধিকাংশ আবাসিকই ঘুমের মধ্যে। ফলে আগুনের খবর বুঝে ওঠার আগেই অনেক ঘর কার্যত ধোঁয়ার ঘেরাটোপে আটকে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথমে পুলিশ ও দমকলকে খবর দেন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন দমকলকর্মীরা। শুরু হয় উদ্ধারকাজ। দীর্ঘ চেষ্টার পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু তত ক্ষণে ঘটে গিয়েছে মর্মান্তিক বিপর্যয়।
‘ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি’, অভিযোগ আবাসিকদের
আগুনের পর হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। আবাসিকদের একাংশের দাবি, আগুন লাগার পরেও ফায়ার অ্যালার্ম বাজেনি। ফলে ঘুমন্ত মানুষজন আগুন বা ধোঁয়ার খবর পান অনেক দেরিতে।
আরও বিস্ফোরক অভিযোগ, হোটেলের এমার্জেন্সি এক্সিট গেট তালাবন্ধ ছিল। বিপদের সময় যে দরজা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসার কথা, সেটিই যদি বন্ধ থাকে, তা হলে আবাসিকদের সামনে কার্যত পথ কমে যায়। পুলিশকে শেষ পর্যন্ত ওই গেট ভাঙতে হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিপদের মধ্যে কয়েক জন আবাসিক বাধ্য হয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে পাইপ ধরে নীচে নামার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ জানলা দিয়ে বেরোনোর পথ খুঁজেছেন। প্রশ্ন উঠছে, একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতির জন্য যে বিকল্প বেরোনোর পথ থাকা বাধ্যতামূলক, সেটি কেন তালাবন্ধ ছিল?
সিঁড়ি ছিল, কিন্তু জানলা বন্ধ!
হোটেল মালিকের দাবি, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল না। দমকলের কর্মীরাও জানিয়েছেন, নিয়ম মেনেই সিঁড়ির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সেই সিঁড়ির জানলাগুলি বন্ধ থাকার বিষয়টি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আগুন লাগার পরে ধোঁয়া বেরোনোর স্বাভাবিক পথ না থাকায় সিঁড়ির অংশেও দ্রুত ধোঁয়া জমে যায় বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে। ফলে আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই অনেকের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়া মানুষজনের ক্ষেত্রে ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা।
আবাসিকদের ডাকে সাড়া মেলেনি কেন?
ঘটনার তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। আবাসিকদের অভিযোগ, বিপদের সময় তাঁরা হোটেল কর্তৃপক্ষকে ডাকাডাকি করলেও দ্রুত সাড়া মেলেনি। যদি আগুন লাগার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক আবাসিককে সতর্ক করা হত, তা হলে কি হতাহতের সংখ্যা কমানো সম্ভব ছিল? কেন ফায়ার অ্যালার্ম কাজ করল না? এমার্জেন্সি এক্সিট কেন তালাবন্ধ ছিল? সিঁড়ির জানলা কেন বন্ধ রাখা হয়েছিল? অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা হত কি না? হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্ত বৈধ অনুমতি ছিল কি না? এই প্রশ্নগুলির উত্তরই এখন খুঁজছে পুলিশ।
‘টিআরডিএ-র গাফিলতি’, অভিযোগ বিজেপি বিধায়কের
ঘটনাকে ঘিরে প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন রামপুরহাটের বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা। তাঁর অভিযোগ, হোটেলকে অনুমতি দেওয়ার পরে নিয়ম মেনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে তারাপীঠ-রামপুরহাট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (টিআরডিএ)-র ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ধ্রুবের দাবি, শুধু এই হোটেল নয়, রামপুরহাট ও তারাপীঠে এমন আরও একাধিক হোটেল রয়েছে যেগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ও বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসনিক নজরদারির অভাব এবং দুর্নীতির কারণেই এমন বিপর্যয় ঘটেছে। তারাপীঠের হোটেলগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
‘গাফিলতি থাকলে কাউকে ছাড়া হবে না’
ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন তিনি। উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণনও ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও জানিয়েছেন, পুলিশ ও প্রশাসন দ্রুত উদ্ধারকাজে নামে এবং বহু মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু সব চেষ্টা সত্ত্বেও আটটি প্রাণ বাঁচানো যায়নি। তাঁর বক্তব্য, এই অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে যাঁদের গাফিলতি রয়েছে, তাঁদের কাউকেই ছাড়া হবে না।
আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য উপযুক্ত আর্থিক সাহায্যের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এখন তাই তদন্তের কেন্দ্রে শুধু আগুনের উৎস নয়, হোটেলের অনুমতি, অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র, ফায়ার অ্যালার্ম, জরুরি দরজা, সিঁড়ি, জানলা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শনের গোটা প্রক্রিয়া। কারণ আগুন কী ভাবে লাগল, তার উত্তর যতটা জরুরি, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, আগুন লাগার পর মানুষগুলি বেরিয়ে আসার পথ কেন পেলেন না? তারাপীঠের এই অগ্নিকাণ্ড সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে।