জীবনে সব ঋণ টাকায় শোধ হয় না। কিছু ঋণ থেকে যায় স্মৃতিতে, কৃতজ্ঞতায়, মানুষের প্রতি বিশ্বাসে। কখনও কখনও সময় সেই ঋণ শোধ করার সুযোগও এনে দেয়। তবে তা ঠিক একই জায়গায় নয়, অন্য এক শহরে, অন্য এক পরিচয়ে, অন্য এক ভূমিকায়।
চার বছর আগে তিনি ছিলেন চাকরিপ্রার্থী। উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা আর প্রত্যাখ্যানের ভিড়ে প্রতিদিন নতুন করে জীবনবৃত্তান্ত পাঠাচ্ছিলেন। পরিচিত-অপরিচিত বহু মানুষের কাছে সাহায্য চাইছিলেন। সেই সময় এক অচেনা মহিলা তাঁর বার্তার উত্তর দিয়েছিলেন। কোনও স্বার্থ ছাড়াই তাঁকে একটি চাকরির জন্য রেফার করেছিলেন।
চার বছর পর ছবিটা পুরো উলটে গেল। এ বার নিয়োগের দায়িত্বে সেই তরুণী। আর সাক্ষাৎকার দিতে এলেন সেই মানুষটি, যিনি একদিন তাঁর জন্য নিজের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত চাকরিটাও পেলেন তিনিই।
লিঙ্কডইনে এই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন রেক্রুটার জুহি ভাটিয়া। তাঁর কয়েকটি লাইনই হাজার হাজার মানুষের মন ছুঁয়ে গিয়েছে। জুহি লিখেছেন, "২০২১ সালে ভারতে একটি চাকরির জন্য যিনি আমাকে রেফার করেছিলেন, ২০২৫-এ দুবাইয়ে সেই মানুষটিকেই আমি নিয়োগ করেছি। জীবন যেন সত্যিই পূর্ণ বৃত্ত সম্পূর্ণ করল।"
গল্পটা শুরু ২০২১ সালে।
তখন জুহির কর্মজীবনের শুরু। হাতে তেমন অভিজ্ঞতা নেই। চাকরির বাজারও কঠিন। প্রতিদিন অসংখ্য আবেদন পাঠিয়েও খুব একটা সাড়া মিলছিল না। সেই সময় লিঙ্কডইনে এক মহিলার প্রোফাইল দেখে সাহস করে একটি বার্তা পাঠান তিনি। পরিচয় ছিল না, আত্মীয়তা ছিল না, কোনও সুপারিশও ছিল না। ছিল শুধু একটি অনুরোধ, "যদি সম্ভব হয়, আমাকে একবার রেফার করবেন?"
আজকের দিনে এমন শত শত বার্তা আসে। বেশিরভাগই উত্তর পায় না। কিন্তু সেই মহিলা উত্তর দিয়েছিলেন। শুধু উত্তরই নয়, নিজের সংস্থায় চাকরির জন্য জুহিকে রেফারও করেছিলেন। হয়তো তাঁর কাছে ঘটনাটি ছিল সাধারণ। কিন্তু জুহির কাছে সেটাই ছিল ভরসার আলো।
তারপর সময় এগিয়েছে। কর্মজীবনে বদল এসেছে। নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন জুহি। এখন তিনি নিজেই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।
সম্প্রতি দুবাইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজছিলেন তিনি। জীবনবৃত্তান্ত দেখতে দেখতে আচমকাই মনে পড়ে যায় চার বছর আগের সেই মহিলার কথা।
আরও একটি কথাও মনে ছিল তাঁর। ২০২১ সালে কথোপকথনের সময় ওই মহিলা বলেছিলেন, "একদিন যদি সুযোগ পাই, দুবাইয়ে কাজ করতে চাই।"
চার বছর পর সেই কথাটি ভুলে যাননি জুহি। তিনি নিজেই যোগাযোগ করেন। জানতে চান, এখনও কি সেই স্বপ্ন আছে? উত্তর আসে— "হ্যাঁ, আছে।" তারপর শুরু হয় সাক্ষাৎকার। দক্ষতার ভিত্তিতেই নির্বাচন। শেষ পর্যন্ত চাকরিটা পেয়ে যান সেই মহিলাই।
জুহির কথায়, "যখন তাঁকে অফার লেটার পাঠাচ্ছিলাম, মনে হচ্ছিল, চার বছর আগে যে মানুষটি আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, আজ তাঁর জন্য কিছু করতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত।"
সবচেয়ে আবেগের মুহূর্তটি এখনও বাকি।
চার বছর ধরে শুধুই ভার্চুয়াল পরিচয়। কোনও দিন মুখোমুখি দেখা হয়নি তাঁদের। এবার নতুন চাকরিতে যোগ দিতে দুবাই গেলে প্রথমবার সামনাসামনি দেখা হবে দুই মহিলার। একজন একদিন সুযোগ দিয়েছিলেন। অন্যজন সময়ের অপেক্ষা করেছিলেন— ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।
লিঙ্কডইনে জুহির এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসতেই অসংখ্য মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছেন। কেউ লিখেছেন, "ভালো মানুষ হওয়ার লাভ একদিন না একদিন ফিরেই আসে।" আবার কারও মন্তব্য, "রেফারেল শুধু চাকরি দেয় না, মানুষের উপর বিশ্বাসও ফিরিয়ে আনে।"
কর্মজীবনের এই গল্প তাই শুধু একটি নিয়োগের ঘটনা নয়। এটি কৃতজ্ঞতার গল্প। মনে রাখার গল্প। আর সেই চিরন্তন সত্যের গল্প— মানুষের জন্য করা একটি ছোট্ট ভালো কাজ কখনও হারিয়ে যায় না। সময় তার হিসাব রাখে। কখনও চার বছর পরে, কখনও অন্য কোনও শহরে, কিন্তু একদিন না একদিন সে ফিরেই আসে।
জীবন ঘুরে দাঁড়ায় এভাবেই! একদিন চাকরি খুঁজছিলেন, চার বছর পর চাকরি দিলেন সেই মানুষকেই যিনি সাহায্য করেছিলেন!