কলকাতা: ২০২২ সালের ২২ জুলাই রাত। কলকাতার এক অভিজাত আবাসনে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তল্লাশি যেন আচমকাই খুলে দিয়েছিল বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। তৎকালীন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছিল ৫০ কোটিরও বেশি নগদ টাকা, বিপুল সোনা, গয়না এবং সম্পত্তির নথি। নোট গোনার জন্য আনতে হয়েছিল একাধিক নোটগণনা যন্ত্র। টাকার স্তূপের সেই ছবি শুধু একটি দুর্নীতির অভিযোগ নয়, বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল।
চার বছর কেটে গিয়েছে। রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রও বদলে গিয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসনে জয়ী হয়ে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু সরকার বদলালেও একটি প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত— বাংলার বুকে কোটি কোটি টাকার এই অঘোষিত নগদ অর্থের উৎস কোথায়?
সেই প্রশ্নই যেন আরও তীব্র হয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলিতে।
বীরভূমে তল্লাশি চালিয়ে অনুব্রত মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত টুলু মণ্ডলের বাড়ি থেকে তদন্তকারী সংস্থার দাবি অনুযায়ী উদ্ধার হয়েছে প্রায় ২৮ কোটি টাকা এবং প্রায় ১৫ কেজি সোনা। তদন্ত চলছে। আদালতে বিচার প্রক্রিয়াও বাকি। ফলে এই অর্থের উৎস বা মালিকানা সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সুযোগ এখনও নেই।
এরই মধ্যে মালদহে মাদক পাচার চক্রের তদন্তে একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা, সোনা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি। তদন্তকারীদের দাবি, অর্থের উৎস, লেনদেনের পথ এবং সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনটি ঘটনার তদন্ত আলাদা। আইনি দিক থেকেও একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়। কিন্তু জনমনে প্রশ্ন একটাই— এত নগদ টাকা বারবার উদ্ধার হচ্ছে কেন? বাংলায় কি এমন একটি সমান্তরাল নগদ অর্থনীতি বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছিল, যার আকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোনও ধারণাই ছিল না?
এক সময় বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি অভিযোগ তুলেছিল, রাজ্যে দুর্নীতি, কাটমানি, বেআইনি ব্যবসা, বালি-পাথর-কয়লা চক্র, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে বিপুল কালো টাকার জাল তৈরি হয়েছে। তৎকালীন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস সেই অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। বিজেপি সরকারে। প্রশাসনের দায়িত্বও তাদের হাতে। ফলে শুধু অতীতের দুর্নীতির তদন্ত করাই নয়, ভবিষ্যতে এমন অর্থনৈতিক অপরাধ রুখতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়ও বর্তমান সরকারের।
তবে আরও একটি প্রশ্ন সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই কোটি কোটি টাকা কি কেবল ব্যক্তিগত লোভের ফল? নাকি বহু বছর ধরে প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা এবং অপরাধচক্রের এক জটিল যোগসূত্রের ফল, যা ধীরে ধীরে বাংলায় একটি সমান্তরাল নগদ অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে?
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজিটাল লেনদেন এবং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার যুগে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বাড়িতে কোটি কোটি টাকা নগদ মজুত থাকার কোনও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা নেই। এমন ঘটনা সাধারণত অপ্রদর্শিত আয়, কর ফাঁকি বা বেআইনি আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে। তবে প্রতিটি মামলার সত্যতা শেষ পর্যন্ত তদন্ত এবং আদালতের বিচারেই প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধারাবাহিক উদ্ধার শুধু দুর্নীতির মামলা নয়; এটি বাংলার রাজনৈতিক অর্থনীতির চরিত্র নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। কারণ কোটি কোটি টাকা উদ্ধার হওয়া যেমন খবর, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ— সেই টাকা কীভাবে তৈরি হল, কোথা থেকে এল, কার জন্য জমা ছিল এবং সেই অর্থের বিনিময়ে কী ধরনের প্রভাব খাটানো হত।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, আজ বাংলার মানুষ আর শুধু নতুন অভিযানের খবর শুনতে চান না। তারা জানতে চান, এতদিন ধরে যে কালো টাকার পাহাড় তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে, তার গোড়া কোথায়। সেই নেটওয়ার্ক কি ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়েছে, নাকি এখনও তার বড় অংশ অদৃশ্য রয়ে গিয়েছে?
অর্পিতার ফ্ল্যাট, টুলু মণ্ডলের বাড়ি, মালদহের ফ্ল্যাট— প্রতিটি অভিযান যেন একই প্রশ্নের দিকে আঙুল তুলছে। সরকার বদলেছে, কিন্তু কালো টাকার গল্প শেষ হয়নি। বরং নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে সেই গল্পের আরও নতুন পৃষ্ঠা খুলছে।
তদন্তের শেষ কথা আদালত বলবে। অভিযুক্তদের অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আইনের চোখে নির্দোষ। কিন্তু জনজীবনের আদালতে একটি প্রশ্ন প্রতিদিন আরও জোরালো হচ্ছে— বাংলার মাটিতে যে বিপুল অঘোষিত অর্থের স্রোত বারবার সামনে আসছে, তার উৎস কি সত্যিই খুঁজে বের করা যাবে? নাকি কোটি কোটি টাকার এই রহস্য আরও বহু বছর বাংলার রাজনীতিকে তাড়া করে বেড়াবে?




