বসিরহাট: সকাল সাড়ে পাঁচটা। বসিরহাটের গ্রামের আকাশে তখনও ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারপাশে পাখির ডাক, দূরে মসজিদ থেকে আজানের সুর। সেই নীরবতার মাঝেই একটি ছোট্ট টিনের চালার ঘর থেকে ভেসে আসে এক চেনা শব্দ— খট... খট... খট...।
এটি কোনও যন্ত্রের আওয়াজ নয়। এটি একটি কাঠের তাঁতের ছন্দ। সেই তাঁতের সামনে বসে আছেন আব্দুল মান্নান। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে এসেছে, চোখের দৃষ্টি আগের মতো নেই। তবুও দিনের পর দিন একই নিষ্ঠায় তিনি বুনে চলেছেন 'মুন্সি গামছা'— এমন এক ঐতিহ্য, যার বয়স প্রায় দেড়শো বছর।
চারপাশে যখন পাওয়ারলুমের দাপটে হাতে বোনা কাপড় একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে, তখন মান্নানের লড়াই যেন সময়ের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
গামছা নয়, বাংলার লোকঐতিহ্যের এক অধ্যায়
গামছা বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষকের কাঁধে, জেলের নৌকায়, শ্রমিকের ঘামে, পুরোহিতের পূজায়— সর্বত্র গামছার উপস্থিতি। কিন্তু সব গামছার পরিচয় এক নয়।
বসিরহাটের মুন্সি গামছা ছিল তার মধ্যে অন্যতম। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, উনিশ শতকের শেষভাগে এই বিশেষ ধরনের গামছা বোনা শুরু হয়। দক্ষ মুসলিম তাঁতি পরিবারগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
এর বিশেষত্ব ছিল সূক্ষ্ম সুতি সুতো, ঘন বুনন, টেকসই কাপড় এবং স্বতন্ত্র নকশা। লাল-সাদা, নীল-সাদা কিংবা চেকের নকশা— সবকিছুই হাতে তৈরি হত। প্রতিটি গামছার বুননে ফুটে উঠত কারিগরের দক্ষতা।
একসময় গ্রামজুড়ে বাজত তাঁতের খটাখট শব্দ
বয়সে প্রবীণ বাসিন্দাদের কথায়, এমন সময় ছিল যখন বসিরহাটের বহু গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই তাঁত ছিল। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁতের শব্দে মুখর থাকত গোটা এলাকা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা গ্রামের বাড়ি থেকে গামছা সংগ্রহ করে কলকাতার বড়বাজার, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, অসম, বিহার, ঝাড়খণ্ড এমনকি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বাজারেও পাঠাতেন। উৎসবের মরসুমে চাহিদা এতটাই বেড়ে যেত যে কারিগরদের রাত জেগে কাজ করতে হত।
একসময় এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল শত শত পরিবার। কারও কাজ ছিল সুতো প্রস্তুত করা, কেউ রং করতেন, কেউ তাঁত বসাতেন, কেউ বুনতেন, কেউ বাজারজাত করতেন। একটি গামছা তৈরির পিছনে জড়িয়ে থাকত গোটা গ্রামের অর্থনীতি।
একটি গামছা তৈরির পিছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টার শ্রম
একটি মুন্সি গামছা তৈরি কোনও সহজ কাজ নয়।
প্রথমে উন্নত মানের সুতি সুতো সংগ্রহ করা হয়। তারপর সেই সুতো ধোয়া, শুকানো, রং করা এবং নির্দিষ্ট অনুপাতে সাজানোর কাজ চলে। এরপর তাঁতে সুতো তোলা হয়। সবশেষে শুরু হয় বুনন।
একটি গামছা সম্পূর্ণ করতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। জটিল নকশা হলে সময় আরও বেশি। কাজের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা। সামান্য ভুল হলেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে গোটা কাপড়।
সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়ারলুম
গত দুই দশকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। পাওয়ারলুমে কয়েক মিনিটে যে পরিমাণ গামছা তৈরি হয়, হাতে তা করতে লাগে কয়েক ঘণ্টা। ফলে উৎপাদন খরচও অনেক কম। বাজারে কম দামের মেশিনে তৈরি গামছা সহজেই জায়গা করে নিয়েছে।
অন্যদিকে তুলো ও সুতোর দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। বিদ্যুতের খরচ, রং, পরিবহণ— সবকিছুর ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি হাতে বোনা গামছার দাম।
ফলে অনেক কারিগর বাধ্য হয়েছেন তাঁত বিক্রি করে অন্য পেশায় চলে যেতে।
নতুন প্রজন্মের অনীহা বাড়াচ্ছে সংকট
আব্দুল মান্নানের আক্ষেপ, তাঁর পরের প্রজন্ম আর এই পেশায় আসতে চায় না।
কারণ স্পষ্ট। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তাই তরুণরা কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ চালক, কেউ ভিন্রাজ্যে কাজ করতে চলে যাচ্ছেন।
এর ফলে শুধু একটি পেশা নয়, হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা এক বিশেষ কারিগরি দক্ষতা।
ঐতিহ্য বাঁচাতে কী প্রয়োজন?
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আবেগ দিয়ে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন, হাতে বোনা মুন্সি গামছার জন্য পৃথক ব্র্যান্ডিং। অনলাইন বিপণনের সুযোগ।
সরকারি বিপণন কেন্দ্রের মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা।
কারিগরদের সহজ ঋণ ও ভর্তুকি। ডিজাইন উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ। ভৌগোলিক স্বীকৃতি (GI Tag) পাওয়ার উদ্যোগ। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হ্যান্ডলুম মেলায় নিয়মিত অংশগ্রহণের সুযোগ। এই পদক্ষেপগুলি বাস্তবায়িত হলে বসিরহাটের মুন্সি গামছা আবারও নতুন বাজার পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একজন কারিগরের লড়াই, আসলে একটি ঐতিহ্যের লড়াই
আব্দুল মান্নান প্রতিদিন তাঁতের সামনে বসেন শুধুমাত্র রোজগারের জন্য নয়। তাঁর বিশ্বাস, তিনি তাঁত ছেড়ে দিলে হয়তো আর কেউ এই গামছা বুনবেন না।
তাঁতের প্রতিটি সুতোয় তাই জড়িয়ে থাকে শুধু কাপড় নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি, শ্রম আর উত্তরাধিকার।
আজ বসিরহাটের যে ক'টি ঘরে এখনও তাঁতের খটাখট শব্দ শোনা যায়, সেগুলিই যেন বাংলার হারিয়ে যেতে বসা লোকঐতিহ্যের শেষ স্পন্দন। প্রশ্ন একটাই এই শব্দ কি আগামী প্রজন্মও শুনতে পাবে, নাকি পাওয়ারলুমের গর্জনে চিরতরে থেমে যাবে দেড়শো বছরের ‘মুন্সি গামছা’র ইতিহাস?