কলকাতা: স্মৃতির শহরে ফিরলেন তিনি। যে শহর একসময় তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিল, আবার বিতর্কের আবহে যেখান থেকে তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল, প্রায় দুই দশক পর সেই কলকাতার মাটিতেই ফের পা রাখলেন নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। শুক্রবার দুপুরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছতেই শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ফুলের তোড়া আর করতালিতে তাঁকে স্বাগত জানান অনুরাগীরা। বহুদিনের অপেক্ষার অবসানে আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারেননি তসলিমাও। হাসিমুখে তাঁর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, "খুবই ভালো লাগছে।"
শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছন তসলিমা। বিমানবন্দরের বাইরে তখন অপেক্ষায় ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী, শুভানুধ্যায়ী এবং আয়োজক সংস্থার সদস্যরা। কেউ ফুল তুলে দেন, কেউ আবার ছবি তুলে স্মরণীয় মুহূর্তটি ধরে রাখেন। শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মধ্যে দিয়ে লেখিকাকে বরণ করে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন পর কলকাতায় ফিরে তাঁর মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। সেই হাসিই যেন বলে দিচ্ছিল, এই শহরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধুই ভৌগোলিক নয়, গভীর আবেগেরও।
কলকাতায় পৌঁছনোর কয়েক ঘণ্টা আগেই সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলেন তসলিমা। রবীন্দ্রনাথের ভাষারীতি অনুসরণ করে তিনি লিখেছিলেন, "আজি এ প্রভাতে কলিকাতা অভিমুখে যাত্রা করিলাম।" ছোট্ট সেই বার্তাই মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। অনুরাগীদের মধ্যে শুরু হয় জল্পনা— সত্যিই কি প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরছেন তসলিমা? কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই জল্পনার অবসান হয়।
শনিবার রবীন্দ্রসদনে মৌলবাদ-বিরোধী কবি-সাহিত্যিকদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছে সেক্যুলার মিশন এবং এইচআরবিএফএফ। বিভিন্ন সাহিত্যিক, শিল্পী, সমাজকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। তসলিমার উপস্থিতিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আগ্রহ তুঙ্গে।
তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে কলকাতার সম্পর্ক বরাবরই বিশেষ। বাংলাদেশ ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় এই শহরেই বাস করেছিলেন তিনি। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য এবং পাঠকের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল কলকাতাকে কেন্দ্র করেই। এখানেই লেখা হয়েছে তাঁর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বই, এখানেই তৈরি হয়েছিল বিস্তৃত পাঠকসমাজ।
কিন্তু ২০০৭ সালে সেই সম্পর্কেই ছেদ পড়ে। তাঁর আত্মজীবনীর অংশ 'দ্বিখণ্ডিত'-সহ কয়েকটি লেখাকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কলকাতার কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে কলকাতা ছাড়তে অনুরোধ করে। পরে তাঁকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ঘটনার পর আর কলকাতায় ফিরে আসা হয়নি তাঁর।
পরবর্তী সময়ে দিল্লিতে কিছুদিন থাকার পর ভারতেও তাঁর দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের সুযোগ হয়নি। এরপর ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কাটাতে হয়েছে জীবনের বড় একটা সময়। তবুও বারবার সাক্ষাৎকারে, প্রবন্ধে এবং সমাজমাধ্যমে কলকাতার কথা লিখেছেন তসলিমা। কখনও দুর্গাপুজোর স্মৃতি, কখনও কলেজ স্ট্রিট, কখনও বইমেলা, আবার কখনও বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে কলকাতা—একটি শহর হিসেবে নয়, এক মানসিক আশ্রয় হিসেবে।
ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে ধারালো অবস্থান, নারীর অধিকার নিয়ে স্পষ্ট মত এবং সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন লেখনির জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিত তসলিমা। তাঁর বই বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। একই সঙ্গে এই লেখালিখির জেরেই তাঁকে বহুবার হুমকি, বিতর্ক এবং নির্বাসনের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
প্রায় দুই দশক পর তাঁর কলকাতা সফর তাই শুধু একজন লেখকের প্রত্যাবর্তন নয়, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারও সাক্ষী। এই সফরকে ঘিরে আবার সামনে এসেছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, লেখকের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমতের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে পুরনো বিতর্ক।
তবে শুক্রবার দমদম বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে কোনও বিতর্ক নয়, বরং আবেগই ছিল সবচেয়ে বড় সত্য। শহরে ফিরেই তসলিমার মুখে উচ্চারিত কয়েকটি শব্দ, "খুবই ভালো লাগছে"— যেন জানিয়ে দিল, সময় অনেক কিছু বদলে দিলেও কিছু সম্পর্ক কখনও মুছে যায় না। কলকাতার সঙ্গে তসলিমা নাসরিনের সম্পর্কও ঠিক তেমনই—বিতর্কের ঊর্ধ্বে, স্মৃতি আর ভাষার গভীর বন্ধনে গাঁথা।