দিব্যেন্দু ঘোষ
নেতাজিকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলার মাশুল। মাঝরাতে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলেন অনন্ত মহারাজ। বাংলার আইকনকে ছোঁয়ার স্পর্ধা! তিন সাগরেদকে গ্রেফতার করতেই ঘুম চোখে তেতো গিলতে হল দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্বঘোষিত মহারাজকে। নেতাজি বিতর্কে কার্যত নাকানিচোবানি খেতে হচ্ছে বিজেপিকে।
রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল তরজা বা কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা এক নিমেষে বদলে দেয় ক্ষমতার সমীকরণ, মাটিতে নামিয়ে আনে অহঙ্কার এবং বাধ্য করে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে অনন্ত মহারাজের সাম্প্রতিক বিতর্কিত মন্তব্য ঠিক তেমনই এক রাজনৈতিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করল। এই ঘটনা কেবল বাংলার আত্মাকে আঘাত করেনি, বরং রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী শিবিরের রণকৌশলকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে প্রমাণ করে দিল, বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে নেতাজির গায়ে হাত তোলা বা তাঁকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলা রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল।
বিতর্কের শুরু ও গেরুয়া শিবিরের অহঙ্কার
ঘটনার শুরু অনন্ত মহারাজ ও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য দিয়ে। নেতাজির মতো মহানায়ককে কেন্দ্র করে যেভাবে একের পর এক অবমাননাকর ও বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়, তাতে গোটা বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি নড়ে ওঠে। গেরুয়া শিবিরের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই ইতিহাসের চরিত্রগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার চশমা দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু যখন সেই রাজনীতির চাবুক সরাসরি জাতীয় বীরদের গায়ে এসে লাগে, তখন সাধারণ মানুষ মানতে পারে না, গর্জে ওঠে। অনন্ত মহারাজের মন্তব্য ছিল বাংলার আবেগ ও ঐতিহ্যের ওপর প্রকাশ্য আঘাত। তারা ভেবেছিল, ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যা খুশি বলা যায় এবং বাংলা তা সহজেই হজম করে নেবে। কিন্তু এই অঙ্ক যে পুরোপুরি ভুল ছিল, তা টের পেতে খুব বেশি দেরি হয়নি।
রাজপথের লড়াই
প্রতিবাদ দাবানলের রূপ নেয়। রাস্তায় নামেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বরাবরই বাংলার স্বাভিমান ও আইকনদের প্রশ্নে আপসহীন। শ্যামবাজারে নেতাজি মূর্তির পাদদেশে তাঁর প্রতিবাদের জেরে বাংলার রাজনীতিতে পরিষ্কার বার্তা চলে যায়, নেতাজির অসম্মান মানে মাটির অসম্মান, এর সঙ্গে কোনও আপস নেই। তৃণমূলের পাশাপাশি বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসও এই ইস্যুতে মাঠে নামে। বিরোধী দলগুলোর এই যৌথ এবং তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়ে কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ে রাজ্য বিজেপি। সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক মহলের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এতটাই প্রবল ছিল যে, গেরুয়া শিবির বুঝে যায়, এই পিচ ধরে এগোলে বিপদ আছে।
পিছু হঠার পালা
বিরোধী শিবিরের দাবি, চাপের মুখে পড়ে বিজেপি সরকারকে মেরুদণ্ড নরম করতে হয়। যে নেতারা দুদিন আগেও বুক ফুলিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের সমর্থনে সাফাই দিচ্ছিলেন, তাঁরাই তড়িঘড়ি সুর নরম করতে বাধ্য হন। অনেকটাই কোণঠাসা হতে শুরু করে পদ্মশিবির। পরিস্থিতি সামাল দিতে তড়িঘড়ি ময়দানে নামেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে নেতাজির নামে সেবাকেন্দ্র গড়ার ঘোষণা করতে বাধ্য হন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এটা বিজেপির মরিয়া ড্যামেজ কন্ট্রোল বা পিঠ বাঁচানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু শুধু ঘোষণাতেই কি আর ক্ষোভ মেটে? রাজ্য সরকার কড়া হাতে আঘাত হানল। অনন্ত মহারাজের বিতর্কিত ভূমিকার জেরে তাঁর হাতে থাকা লোভনীয় বঙ্গবিভূষণ সম্মান কেড়ে নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, নেতাজিকে নিয়ে তাঁর উসকানিমূলক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের বিরুদ্ধে সরাসরি পুলিশি পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের ফলও হাতেনাতে মিলতে থাকে। পুলিশের জালে পড়ে অনন্ত মহারাজের তিন ঘনিষ্ঠ।
গভীর রাতের আত্মসমর্পণ
এই রাজনৈতিক নাটকের সবচেয়ে নাটকীয় এবং জমজমাট অধ্যায়টি রচিত হল গভীর রাতে। যে অনন্ত মহারাজ এতদিন ক্ষমতার দম্ভে যা খুশি তাই বলে বেড়াচ্ছিলেন, পুলিশি অ্যাকশন এবং জন-প্রতিবাদের উত্তাপ গায়ে লাগতেই তাঁর সেই বীরত্ব কর্পূরের মতো উবে গেল। দিনের বেলায় যিনি বাঘের মতো গর্জেছিলেন, গভীর রাতে তিনিই নেতাজিকে সমর্থন করে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে এলেন এবং অবশেষে দুঃখপ্রকাশ ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হলেন। এই আত্মসমর্পণ প্রমাণ করে দিল যে, বাংলার রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয় না এবং শেষ পর্যন্ত মাটির টান ও জনগণের ক্ষোভের কাছে বড় বড় বাঘেরাও লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হয়।
কার লাভ, কার ক্ষতি?
এই গোটা এপিসোড বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে গভীর ও সুদূরপ্রসারি বার্তা রেখে গেল। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, দিল্লির কেন্দ্রীয় ক্ষমতার জোরে বা ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বাংলায় রাজনীতি করতে গেলে হেভিওয়েট নেতাদেরও নাকানিচোবানি খেতে হয়। বাংলার মনস্তত্ত্ব না বুঝে আইকনদের অপমান করার যে মাশুল বিজেপিকে দিতে হল, তা তাদের সাংগঠনিক ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। অনন্ত মহারাজের এই ধরনের বেহিসাবি মন্তব্য এবং পরবর্তীতে দলীয়ভাবে তা সামলাতে না পেরে পিছু হঠা প্রমাণ করে যে, রাজ্যে বিজেপির অন্দরে সমন্বয় ও দূরদর্শিতার মারাত্মক অভাব এখনও রয়েছে। মুখের বুলি আউড়ে রাজনীতি হয় না, তার জন্য যে দূরদর্শী রাজনৈতিক বিচক্ষণতা দরকার, তা এই ঘটনায় ছিল পুরোপুরি অনুপস্থিত।
শেষ পর্যন্ত, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামটাই আরেকবার জয়ী হল। যারা তাঁকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে চেয়েছিল কিংবা ছোট করতে চেয়েছিল, আজ তাদেরই রাতের অন্ধকারে ক্ষমা চেয়ে পিছু হটতে হল। এই লড়াই শুধু একটা প্রতিবাদের গল্প নয়, বাংলার রাজনৈতিক সচেতনতার এক অনন্য দলিল, যেখানে শেষ হাসি সবসময় বাংলার স্বাভিমানই হাসে।
তবে এক্ষেত্রে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের প্রসঙ্গটি একটু আলাদা। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নেতাদের নেতা ও কালজয়ী সত্তা হিসেবে অভিহিত করে প্রশংসা করেছেন যে, নেতাজি বেঁচে থাকলে দেশভাগ হত না। তবে ফরোয়ার্ড ব্লক ও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ইতিহাস নিয়ে তাঁর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। শমীক ভট্টাচার্য বলেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যদি কংগ্রেস থেকে বিতাড়িত না হতেন এবং ভারতে উপস্থিত থাকতেন, তবে দেশভাগ আটকানো যেত এবং এভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হত না। তাঁর মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু নেতাজি সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে কালজয়ী সত্তা হিসেবে প্রতিটি জাতীয়তাবাদী মানুষের অন্তরে প্রতিষ্ঠিত। নেতাজি ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতকে খণ্ডিত করার বিপক্ষে ছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কলকাতা কর্পোরেশনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে নেতাজির কথোপকথন শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন বলে শমীক দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, অতীতে ফরওয়ার্ড ব্লকের কর্মীরা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে ফরওয়ার্ড ব্লকের ভূমিকা নিয়ে তাঁর তীব্র সমালোচনা রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তিনি অবশ্য বলেন, নেতাজিকে নিয়ে মানুষের আবেগ যদি আহত হয়, তার জন্য পার্টি চিন্তাভাবনা করবে। কার্যত তারই ফল মিলল অনন্ত মহারাজের মধ্যরাতের ক্ষমার মধ্যে দিয়ে।