দিব্যেন্দু ঘোষ
প্রায় দু’দশক বা দীর্ঘ কুড়ি বছর পর নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় ফেরা। এক ব্যক্তির ঘরবদল বা নির্দিষ্ট কোনও সাহিত্যসভায় যোগদানের ঘটনা নয়; এটা দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বাংলা তথা ভারতের ক্ষমতার পরিবর্তনের অত্যন্ত জটিল ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দলিল। ১৯৯৪ সালে মৌলবাদের ছোবলে জন্মভূমি বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন ‘লজ্জা’র লেখিকা। ২০০৭ সালে বাংলায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মুখ্যমন্ত্রিত্বে তৎকালীন সিপিএম সরকারের আমলে ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসের জন্য চরম অশান্তির আশঙ্কায় বিতাড়িত হন তিনি। তসলিমার জীবন মানেই রাজনৈতিক বলপ্রয়োগ ও নির্বাসনের দীর্ঘ ইতিহাস। পরবর্তীকালে প্রায় পনেরো বছরের তৃণমূল জমানাতেও যখন তাঁর ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল, তখন প্রশ্ন উঠেছিল, ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা কি তবে আসলে ভোটব্যাঙ্ক ও তোষণের রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল? আজকের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রশাসনের প্রচ্ছায়ায় তাঁর এই ফেরা সেই পুরনো প্রশ্নগুলোকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে।
এই ঘটনার সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান দিক স্পষ্টভাবে সামনে আসে। প্রথমত, সিপিএম জমানায় তসলিমা নাসরিনকে তাড়ানোর ঘটনাটি ছিল তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ বাম রাজনীতির চরম নৈতিক সংকটের মুহূর্ত। যে দল নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মুক্তচিন্তার ধারক বলে দাবি করত, তারা কট্টরপন্থী শক্তির রক্তচক্ষুর সামনে নুয়ে পড়ে। একজন নারী লেখককে নিরাপদ আশ্রয় দিতে ব্যর্থ হয়। এরপর রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে। ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল আমলেও তসলিমার জন্য কলকাতার দরজা খোলেনি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের সমীকরণকে অক্ষুণ্ণ রাখতেই তৃণমূল নেতৃত্ব তসলিমাকে ব্রাত্য করে রাখে। ফলে বাম ও তৃণমূল— দুই সরকারের আমলেই প্রান্তিকীকরণের শিকার হন তসলিমা। সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে বারবার প্রশ্ন উঠেছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তবে কি কেবল রাজনৈতিক সুবিধাবাদের মাপকাঠিতেই নির্ধারিত হবে?
দ্বিতীয়ত, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিজেপির পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ আনুকূল্যে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের আইনি অনুমোদনের সুবাদে তাঁর এই কলকাতা প্রত্যাবর্তন সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। বিজেপির আমন্ত্রণে সরাসরি না হলেও, একটি স্বাধীন সংগঠনের আমন্ত্রণে এবং রাজ্য প্রশাসনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণের মাধ্যমেই তিনি আজ তিলোত্তমায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এর পেছনে রয়েছে একটি সুচিন্তিত আদর্শগত চাল। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রবক্তারা বরাবরই তসলিমা নাসরিনের ওপর চলা ইসলামি কট্টরপন্থার আগ্রাসনকে সামনে এনে তথাকথিত ‘তোষণ রাজনীতি’র কড়া সমালোচনা করে এসেছেন। আজ যখন প্রশাসনিক ও আইনি অনুমতি মিলেছে, তখন বিরোধী বা শাসক শিবিরের রাজনৈতিক সমীকরণে তসলিমা এক অদৃশ্য রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সংখ্যালঘুদের তোষণ করার নীতিকে আক্রমণ করা সহজ হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে নিজেদের মুক্তচিন্তা ও নারী স্বাধীনতার সমর্থক হিসেবে জাহির করার সুযোগ পাচ্ছে বর্তমান রাজনৈতিক শিবির।
তসলিমার এই ফেরা সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাঙালি সমাজ ও মধ্যবিত্ত মানস দীর্ঘদিন ধরেই এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতার মধ্যে বাস করছে। তসলিমার লেখালেখি পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, রক্ষণশীলতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তীব্র আঘাত। অথচ তাঁকেই যখন নিজের পছন্দের সাংস্কৃতিক রাজধানী ও মাতৃভাষার শহর কলকাতা থেকে দূরে রাখা হয়েছিল, তখন তা সমাজের অন্তর্নিহিত অসহিষ্ণুতারই প্রকাশ ঘটিয়েছিল। আজ কুড়ি বছর পর যখন তাঁর পোস্টারে শহর সেজে উঠেছে এবং তিনি রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে পা রাখছেন, তখন তা নিছক কোনও একজন ব্যক্তির জয় নয়; দীর্ঘদিনের দমবন্ধ করা রাজনৈতিক ও সামাজিক বাতাবরণে এক চিলতে মুক্ত হাওয়ার মতো।
তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তন কোনও সাধারণ সাহিত্যিক সফর নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শের সুবিধাবাদী অবস্থান এবং রাজনৈতিক দলের রণকৌশলের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। বামেদের ত্যাগ, তৃণমুলের ব্রাত্য করার নীতি এবং অবশেষে গেরুয়া শিবিরের অনুমোদনের বাতাবরণে তসলিমার কলকাতা ফেরা প্রমাণ করে, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু না থাকলেও, সাহিত্যিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কীভাবে রাজনৈতিক চাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এটা তারই উজ্জ্বল ও জটিল উদাহরণ।