নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত
কলকাতা: স্বাধীনতার ৮০ বছর। আর সেই উপলক্ষকেই সামনে রেখে কলকাতায় ফের মানুষের দরজায় পৌঁছনোর চেষ্টা সিপিএমের। আগামী ১১ থেকে ১৪ অগস্টের মধ্যে শহরের ৮০টি এলাকায় ৮০টি সভা করার পরিকল্পনা নিয়েছে কলকাতা জেলা কমিটি। দলের কথায়, উদ্দেশ্য শুধু সরকার-বিরোধী স্লোগান বা রাজনৈতিক প্রচার নয়। স্বাধীনতার ইতিহাস, দেশভাগ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনাকে দলীয় গণ্ডি থেকে বার করে বৃহত্তর সমাজের মধ্যে নিয়ে যাওয়া। তবে বামেদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান এবং বাংলায় ক্রমশ সঙ্কুচিত সাংগঠনিক পরিসরের দিকে তাকালে এই উদ্যোগের মধ্যে জনসংযোগের পাশাপাশি নতুন করে জনভিত্তি তৈরির চেষ্টাও দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
এক সময় বাংলার রাজনীতিতে দীর্ঘ দিন ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল বামফ্রন্ট। বিধানসভা থেকে পঞ্চায়েত—রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল বামেদের শক্ত সাংগঠনিক উপস্থিতি। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সেই ভিত্তি ক্রমশ ক্ষয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তৃণমূলের উত্থান এবং বিজেপির দ্রুত বিস্তারের মধ্যে রাজ্যের রাজনৈতিক লড়াই কার্যত দ্বিমেরু হয়ে ওঠে। সেই সমীকরণে বামেদের জায়গা আরও সঙ্কুচিত হয়েছে। বিধানসভা থেকে সংগঠন—দুই ক্ষেত্রেই সেই দুর্বলতার ছাপ পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোই সিপিএমের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
সেই প্রেক্ষাপটেই স্বাধীনতার ৮০ বছরকে সামনে রেখে কলকাতার ৮০টি এলাকায় সভার পরিকল্পনা তাৎপর্যপূর্ণ। সোমবার প্রমোদ দাশগুপ্ত ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে কর্মসূচির কথা জানান সিপিএমের কলকাতা জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার। তাঁর বক্তব্য, ‘‘বৃহত্তর অংশের মানুষকে যুক্ত করতে চাই।’’ সেই লক্ষ্যেই শুধু দলের নেতা-কর্মীদের দিয়ে সভা না করে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষকে আলোচনায় টানার চেষ্টা হচ্ছে।
ইতিহাসবিদ, গবেষক, শিক্ষক, রাজনৈতিক বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মী, নাট্যকর্মী—বিভিন্ন পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানান কল্লোল। তাঁদের অনেকেই সরাসরি বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তবু স্বাধীনতা ও দেশের ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় তাঁদের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিচ্ছে দল। সিপিএমের দাবি, ৮০টি সভার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জায়গায় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মূল বক্তা হিসেবে থাকবেন। পাশাপাশি দলের নেতা, জেলা কমিটির সদস্য এবং পার্টি স্কুলের শিক্ষক ও কর্মীরাও বক্তব্য রাখবেন।
রাজনৈতিক ভাবে এর তাৎপর্য এখানেই। দীর্ঘদিন ধরে বামেদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে—দলীয় পরিসরের বাইরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ দুর্বল হয়েছে—সেই জায়গায় ইতিহাসকে হাতিয়ার করে নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ তৈরির চেষ্টা করছে কলকাতা জেলা সিপিএম। স্বাধীনতা আন্দোলন এবং দেশভাগের মতো বিষয়কে সামনে রেখে এমন একটি আলোচনা তৈরি করতে চাইছে দল, যেখানে শুধু বাম সমর্থকেরাই থাকবেন না, অন্য মতের মানুষও প্রশ্ন করতে পারবেন, নিজেদের বক্তব্য রাখতে পারবেন।
কল্লোলের বক্তব্য, স্বাধীনতা, দেশভাগ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা নিয়ে দলের ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে চর্চা রয়েছে। কিন্তু সেই চর্চাকে আরও বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে নিয়ে যাওয়াই এ বার লক্ষ্য। অর্থাৎ রাজনৈতিক সভার চেনা কাঠামোর বদলে ইতিহাসের আলোচনাকে সামনে রেখে মানুষের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা।
এই কর্মসূচি দলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত বলে জানিয়েছেন কল্লোল। তাঁর মতে, রাজনৈতিক কর্মীদের শুধু সাংগঠনিক কাজ করলেই হবে না। ইতিহাস, রাজনীতি এবং মতাদর্শ নিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা ও আলোচনা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে বামেদের সাংগঠনিক দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসাবে যে রাজনৈতিক শিক্ষার ঘাটতির কথা দলের অভ্যন্তরেও আলোচিত হয়েছে, সেই জায়গায় কর্মীদের নতুন করে সক্রিয় করার চেষ্টাও রয়েছে এই উদ্যোগে।
তবে ৮০টি সভা করার কাজ সহজ নয়। তার উপর অগস্টের বর্ষা। খোলা জায়গায় সভার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও বৃষ্টি বা পুলিশের অনুমতির কারণে কোনও এলাকায় নির্ধারিত দিনে কর্মসূচি করা না গেলে পরবর্তী দিনে তা করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কল্লোল।
এই কর্মসূচির মধ্যে বর্তমান রাজনীতির ছায়াও স্পষ্ট। সাংবাদিক বৈঠকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছেন কলকাতা জেলা সম্পাদক। তাঁর অভিযোগ, একটি মিছিল বা সমাবেশে যোগ দিতে যাওয়া বাম কর্মীদের ‘দেশদ্রোহী’ বলে স্লোগান দিয়ে আক্রমণের চেষ্টা হয়েছে। সেই প্রসঙ্গেই ‘দেশদ্রোহিতা’ বলতে কী বোঝায়, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি তাঁর।
কল্লোলের বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোনও একটি তকমা দিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। মানুষের নিজের অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক দলগুলির দাবির মধ্যে কতটা মিল রয়েছে, সেই বিচার মানুষই করবেন। মতপার্থক্য, বিতর্ক এবং পাল্টা যুক্তির জায়গা না থাকলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই বক্তব্যের মধ্যেও বামেদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের একটি বার্তা রয়েছে। তৃণমূল এবং বিজেপিকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনীতি যখন ক্রমশ মেরুকৃত, তখন নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করাই বামেদের বড় চ্যালেঞ্জ। এক দিকে তৃণমূল-বিরোধী রাজনীতিতে বিজেপির উত্থান, অন্য দিকে তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত—এই দুই মেরুর বাইরে বামেদের নিজস্ব রাজনৈতিক বক্তব্য কতটা মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে, সেটিই এখন প্রশ্ন।
সিপিএমের দাবি, তারা সেই জায়গাটিই ফের তৈরি করতে চাইছে। ইতিহাস, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য—এই বিষয়গুলিকে সামনে রেখে মানুষের সঙ্গে কথোপকথনের পরিসর বাড়াতে চাইছে দল। সরাসরি ভোটের রাজনীতিতে তার ফল কতটা মিলবে, তা অবশ্য এখনই বলা কঠিন। কিন্তু সংগঠন দুর্বল হওয়ার পরে মানুষের মধ্যে ফের দৃশ্যমান হওয়া যে বামেদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, ৮০টি সভার এই পরিকল্পনায় সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।
এর আগে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে একটি বক্তব্যের পর হিন্দুত্ববাদীদের আক্রমণের অভিযোগও তুলেছেন কল্লোল। তাঁর দাবি, সেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করে এফআইআর এবং পরে আরও বড় জমায়েতের মাধ্যমে কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, চাপের মুখেও মাঠ ছাড়বে না—এই বার্তাও দিতে চাইছে দল।
স্বাধীনতার ৮০ বছর তাই সিপিএমের কাছে শুধু অতীত স্মরণের উপলক্ষ নয়। বাংলায় বামেদের যে রাজনৈতিক জমি গত কয়েক বছরে অনেকটাই সরে গিয়েছে, সেই জমিতে ফের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সেতু তৈরি করাই এখন বড় পরীক্ষা। কলকাতার ৮০টি সভা সেই পরীক্ষারই প্রথম ধাপ।
ইতিহাসের পাঠ দিয়ে কি বর্তমানের রাজনৈতিক দূরত্ব কমানো যাবে? দলীয় কর্মীদের গণ্ডি পেরিয়ে কি সত্যিই বৃহত্তর সমাজকে আলোচনায় টানা যাবে? আর সেই যোগাযোগ কি আগামী দিনে ভোটের রাজনীতিতে বামেদের হারানো জমি ফেরানোর ভিত্তি তৈরি করবে? কলকাতার ৮০ সভার আসল রাজনৈতিক তাৎপর্য এখন সেখানেই।