সিউড়ি: দেউচা-পাচামির নাম উচ্চারিত হলেই সামনে আসে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কয়লা ভাণ্ডারের সম্ভাবনা। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ— সব মিলিয়ে এই প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক বিশাল প্রত্যাশা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার ঠিক উল্টো ছবিটাই ধরা পড়ছে এলাকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয়। কয়লা ও পাথরের ধুলোয় প্রতিদিন বিষাক্ত হয়ে উঠছে বাতাস। সেই ধুলো ফুসফুসে জমে নিঃশব্দে কেড়ে নিচ্ছে মানুষের শ্বাস। আর সেই ভয়াবহ রোগের মোকাবিলায় যে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর ভরসা করার কথা, সেটিই আজ কার্যত অসুস্থ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকব্যথা বা ফুসফুসের নানা সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চিকিৎসকেরা সিলিকোসিসের আশঙ্কার কথা বললেও রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এলাকাতেই নেই। ফলে রোগীদের সিউড়ি, বোলপুর বা কলকাতার হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। বহু দরিদ্র পরিবার সেই খরচ বহন করতে না পেরে মাঝপথেই চিকিৎসা বন্ধ করে দিচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এলাকার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক। বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ নেই, আধুনিক পরীক্ষার ব্যবস্থাও সীমিত। অনেক সময় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে রেফার করাই একমাত্র পথ। ফলে জরুরি সময়ে চিকিৎসা পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র যেন শুধুই নামেই আছে, বাস্তবে তা কার্যত আইসিইউতে থাকা এক অসুস্থ প্রতিষ্ঠানের মতো।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলিকোসিস একটি মারণ পেশাগত রোগ। দীর্ঘদিন সিলিকা ধুলো শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়। রোগ যত বাড়ে, ততই কমতে থাকে শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা। একসময় সামান্য হাঁটাচলাও কষ্টকর হয়ে ওঠে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়, এই রোগ পুরোপুরি নিরাময়ের কোনও চিকিৎসা এখনও নেই। তাই সময়মতো রোগ ধরা পড়া এবং ধুলো থেকে সুরক্ষা— এই দু'টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেউচা-পাচামির মতো এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য নথি, মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত ডায়াগনস্টিক পরিষেবা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি খনি ও পাথর খাদান এলাকায় ধুলো নিয়ন্ত্রণে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা, শ্রমিকদের মানসম্মত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং সিলিকোসিস আক্রান্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও সমান প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রশ্নও স্পষ্ট— যদি দেউচা-পাচামি রাজ্যের ভবিষ্যৎ শিল্পনগরী হতে চলেছে, তবে সেই এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেন এখনও এত অবহেলিত? উন্নয়নের আলো কি শুধু কয়লার ভাণ্ডার পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি পৌঁছাবে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসকের চেম্বার এবং রোগীর নিঃশ্বাসেও?
দেউচা-পাচামির গল্প এখন শুধু একটি খনি প্রকল্পের গল্প নয়। এটি উন্নয়ন বনাম জনস্বাস্থ্যের এক কঠিন বাস্তবের গল্প। যেখানে একদিকে কোটি কোটি টাকার শিল্প বিনিয়োগের স্বপ্ন, অন্যদিকে প্রতিদিন ধুলো গিলে নিঃশব্দে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলা অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস। প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়নের হিসাব কষতে গিয়ে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য কি আবারও উপেক্ষিত থেকে যাবে?