নিউজ ডেস্ক: লোহার চাকার নিচে পিষ্ট হয়নি স্নেহ, খিদের কান্না থামাতে লাল সিগন্যালে দাঁড়াল দার্জিলিং মেল। একরত্তির মুখে দুধ তুলে দিল রেলকর্মীরা। দুর্যোগের মাঝেও কখনও কখনও জ্বলে ওঠে মানবতার আলো। ফরাক্কার লাইনে ধস নেমে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া রেলপথে যখন হাজারো যাত্রীর চোখেমুখে কেবলই ক্লান্তি আর বিরক্তি, ঠিক তখনই নৈহাটি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে রচিত হলো এক বুক জুড়িয়ে যাওয়া গল্প।
নিয়মকানুনের নিশ্ছিদ্র দেয়াল ভেঙে, কোনো নির্ধারিত স্টপেজ না থাকা সত্ত্বেও একরত্তি শিশুর কান্নার কাছে হার মানল গতি। জরুরি সিগন্যালে দাঁড়িয়ে পড়ল প্রিমিয়াম দার্জিলিং মেল শুধু এক অসহায় মায়ের কোলে থাকা ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে একটু দুধ তুলে দেওয়ার জন্য।
কিশানগঞ্জ থেকে যখন দার্জিলিং মেলের এ-২ কোচের ৩৫ নম্বর বার্থে শিশুটিকে নিয়ে উঠেছিলেন ওই মা, তখন হয়তো ভাবেননি পথ এতটা দীর্ঘ আর যন্ত্রণাময় হবে। ফরাক্কার বিপর্যয়ে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বা ঘুরপথে চলছে ট্রেন। পরিকল্পনা ছিল, মালদহ পেরোলে কোনো এক চেনা হাত বাচ্চার জন্য দুধ তুলে দেবে জানালায়।
কিন্তু নিয়তির ফেরে মালদহের পর ট্রেনটির পথ পুরো বদলে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় বিকল্প রুটে। বাতিল হয়ে যায় পরের সব স্টপেজ। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, কিন্তু ট্রেনের চাকা ঘোরে মন্থর গতিতে। সময়ের হিসাব ছাড়িয়ে ট্রেন যখন আট ঘণ্টা দেরিতে, তখন ট্রেনের কামরায় খিদের জ্বালায় অঝোরে কেঁদে চলেছে কোলের শিশুটি। অসহায় এক মায়ের চোখের জলের কাছে তখন গোটা পৃথিবীটাই যেন অন্ধকার।
ট্রেনের ভেতর থেকেই কাঁপাকাঁপা গলায় সুদূর উত্তরপ্রদেশে থাকা স্বামী আজগার আলিকে ফোন করেন ওই মহিলা। দূর পরবাসে বসে থাকা এক বাবার বুকও হয়তো কেঁপে উঠেছিল সন্তানের এই আর্তনাদে। দিশাহারা বাবা কালবিলম্ব না করে আকুল আবেদন জানান রেলের ‘রেল মদত’ অ্যাপে "আমার বাচ্চাটা খিদেয় ছটফট করছে, ট্রেনের ভেতর একটু দুধ পৌঁছে দিন!" বার্তাটি শিয়ালদহ কমার্শিয়াল কন্ট্রোলের হাত ঘুরে পৌঁছায় ডিআরএম-এর কাছে। লাল ফিতের বাঁধন ছিঁড়ে নিমেষেই জেগে ওঠে রেলের মানবিক সত্ত্বা।
ট্রেনটি প্রথমে ব্যান্ডেলে পৌঁছালে সেখানে রেলকর্মীরা ব্যাকুল হয়ে খুঁজতে থাকেন ওই মা ও শিশুকে। কিন্তু ভিড়ের চাপে প্রথম দফায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। বাচ্চার খিদের সময়ের কাছে প্রতিটি সেকেন্ড তখন দামি। কোনো ঝুঁকি না নিয়ে তৎক্ষণাৎ নির্দেশ যায় নৈহাটি স্টেশনে। সেখানে দার্জিলিং মেলের থামার কোনো নিয়মই নেই। তবু একরত্তির জীবনের তাগিদে লাইনে ফেলে দেওয়া হলো জরুরি লাল সিগন্যাল।
গতি থমকে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে পড়ল ট্রেন। প্ল্যাটফর্মজুড়ে একঝাঁক রেলকর্মীর উদ্বিগ্ন দৌড়ঝাঁপ,কোথায় সেই মা? কোথায় সেই কচি মুখ? অবশেষে মিলল খোঁজ।
হাঁপাতে হাঁপাতে কামরার জানালায় এক মায়ের কম্পিত হাতে রেলকর্মীরা যখন পরম যত্নে তুলে দিলেন দুধের বোতল, তখন প্ল্যাটফর্মের গুমোট বাতাসও যেন একমুহূর্তে ভিজে উঠল স্বস্তির নিঃশ্বাসে। তৃপ্তির ঢোক গিলে যখন শান্ত হলো শিশুটি, মায়ের চোখে তখন অশ্রুর আনন্দধারা।
সুদূর উত্তরপ্রদেশ থেকে ফোনে আজগার আলির গলা ধরে আসছিল কৃতজ্ঞতায়। জানালেন, এই দুর্যোগের দিনে রেলের এই দেবদূতের মতো রূপ তাঁর পরিবার কোনোদিন ভুলবে না। অবশেষে নির্ধারিত সময়ের প্রায় আট ঘণ্টা পর দুপুর ১টা ৪৩ মিনিটে শিয়ালদহ স্টেশনে যখন দার্জিলিং মেল প্রবেশ করল, তখন দেরির সব বিরক্তি ফিকে হয়ে গেছে।