কিছু কিছু দিন ক্যালেন্ডারের পাতায় শুধু তারিখ হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে ইতিহাসের মোড়। ৫ আগস্ট তেমনই এক দিন। সাত বছর আগে, ২০১৯-এর এই দিনে জম্মু ও কাশ্মীরের ইতিহাসে নেমে এসেছিল এক বড় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তন। সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে জম্মু ও কাশ্মীরকে নতুন প্রশাসনিক কাঠামোয় আনা হয়েছিল। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছিল দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ।
সাত বছর পর সেই সিদ্ধান্তের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, ইতিহাসের কোনও দরজা একবার বন্ধ হলেই তার ওপারে থাকা প্রশ্নগুলি মুছে যায় না। বরং সময়ের সঙ্গে সেগুলি নতুন ভাষায় ফিরে আসে। ৩৭০-র ক্ষেত্রেও তাই। একদিকে কেন্দ্রের দাবি এই সিদ্ধান্তের পর কাশ্মীরে উন্নয়ন, বিনিয়োগ, পরিকাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কারের নতুন গতি এসেছে। অন্যদিকে বিরোধীদের বক্তব্য, বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীরের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও শেষ হয়েছে।
২০১৯-এর ৫ আগস্ট তাই শুধুমাত্র একটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্তের দিন নয়; এটি ভারতীয় রাজনীতিতে এক দীর্ঘ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। যে সিদ্ধান্তকে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ‘এক দেশ, এক সংবিধান’-এর পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি সেটিকেই জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিক অধিকারের সংকোচন বলে ব্যাখ্যা করেছে।
এই সাত বছরে অবশ্য কাশ্মীরের মাটিতে অনেক কিছু বদলেছে। কেন্দ্রের দাবি, পর্যটন, পরিকাঠামো, শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একাধিক কেন্দ্রীয় আইন ও প্রকল্পের পূর্ণ প্রয়োগের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি পরিষেবার পরিধিও বেড়েছে। কাশ্মীরের রাস্তায় পর্যটকের ভিড়, নতুন পরিকাঠামো এবং উন্নয়নের নানা ছবি সেই পরিবর্তনের একটি দিক তুলে ধরে।
কিন্তু একটি ভূখণ্ডের গল্প কেবল রাস্তা, সেতু কিংবা বিনিয়োগের পরিসংখ্যান দিয়ে লেখা যায় না। মানুষের মনে কী আছে, সেটিও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সেই প্রশ্ন আরও গভীর। কারণ এখানে উন্নয়নের পাশাপাশি জড়িয়ে আছে পরিচয়, আস্থা, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অধিকার এবং বহু দশকের ক্ষত।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট ৩৭০ বিলোপের সিদ্ধান্তকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ বলে রায় দেয়। সেই রায়ের পর বিতর্কের কেন্দ্র কিছুটা বদলে যায়। ৩৭০ ফিরবে কি না, তার আইনি প্রশ্নের পরিবর্তে সামনে আসে রাজনৈতিক প্রশ্নটি: জম্মু ও কাশ্মীর আবার পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা কবে পাবে?
২০২৪ সালে দীর্ঘ বিরতির পর বিধানসভা নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকার গঠন সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির চাকা আবার ঘুরেছে, মানুষের ভোটে সরকার এসেছে। কিন্তু পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এখনও ফেরেনি। ফলে কাশ্মীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ার বদলে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বারবার রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ৩৭০ পুনরুদ্ধারের দাবি রাজনৈতিকভাবে যতই বিতর্কিত হোক, রাজ্যের মর্যাদা ফেরানো এখন একটি বাস্তব রাজনৈতিক প্রত্যাশা। এই দাবির মধ্যে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রশ্ন নেই; রয়েছে নির্বাচিত সরকারের সাংবিধানিক পরিসর এবং মানুষের রাজনৈতিক আত্মমর্যাদার প্রশ্নও।
অন্যদিকে বিজেপির কাছে ৫ আগস্ট বিজয়ের প্রতীক। দলটির বক্তব্য, কয়েক দশকের জটিলতা কাটিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরকে দেশের মূল প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার পথ খুলেছে ২০১৯-এর সিদ্ধান্ত। সাত বছর পূর্তিতেও সেই অবস্থানেই অনড় কেন্দ্রীয় শিবির।
এই দুই বিপরীত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাধারণ কাশ্মীর। তাদের কাছে ইতিহাসের বড় বড় শব্দের চেয়ে জীবনের ছোট ছোট নিশ্চয়তাই হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের জন্য একটি ভালো স্কুল, তরুণের জন্য একটি চাকরি, ব্যবসায়ীর জন্য নিরাপদ বাজার, পরিবারের জন্য নিশ্চিন্ত রাত, এই বাস্তব প্রশ্নগুলিই শেষ পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সাফল্যের মাপকাঠি।
কাশ্মীরের সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছে অগণিত। বরফে ঢাকা পাহাড়, ডাল লেক, চিনারের পাতা সবই ভারতের কল্পনায় কাশ্মীরকে এক অনন্য রূপ দিয়েছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা মানুষের স্বপ্ন, ক্ষত এবং প্রত্যাশার কথাও সমানভাবে শুনতে হবে।
সাত বছর আগে ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় বদলে দেওয়া হয়েছিল। সাত বছর পরে প্রশ্ন আর শুধু ৩৭০ থাকবে না। প্রশ্ন হবে, তার পরের কাশ্মীর কেমন হল?
একটি সিদ্ধান্ত ইতিহাসের গতিপথ ঘুরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের সত্যিকারের জয় তখনই, যখন সেই পরিবর্তনের আলো পৌঁছয় মানুষের ঘরে। কাশ্মীরের আকাশে আজ তাই শুধু সাত বছরের স্মৃতি নয়, আরও একটি প্রত্যাশা, রাজনীতির তর্ক পেরিয়ে শান্তি, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মর্যাদার একটি স্থায়ী সকাল।