গর্জে উঠল পিস্তল! একবার নয়, দুবার নয়...পাঁচবার! লক্ষ্য বাংলার গভর্নর। সমাবর্তন সভায় তখন হৈ চৈ, চেঁচামেচি। চরম গণ্ডগোলের মধ্যেও মাথা ঠাণ্ডা রেখে আততায়ীর হাত ধরে ফেললেন উপাচার্য হাসান সুরাবর্দি। কী আশ্চর্য আততায়ী একটি তরুণী! ৬ই ফেব্রুয়ারি,১৯৩২। মঞ্চে তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছেন গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন। তার সামনে আনা হল মেয়েটিকে। শুরু হল ' ইন্টারোগেশন'। কাকে জানেন?
ইংরেজ পুলিশ তাকে কোন কিছুতেই দমাতে পারেনি। ডাকা হল তাঁর বাবাকে। তাঁর বাবাও কোন সাধারণ মানুষ নন। তাঁর সবথেকে বড় পরিচয় ভারতের সকলেই জানে। তিনি বাংলা মায়ের সবথেকে সেরা দামাল ছেলে, বিপ্লবীদের শ্রেষ্ঠ আর্দশ সুভাষ চন্দ্র বসু'র শিক্ষক। তাঁর নাম বেণীমাধব দাস। ছোট্ট সুভাষ কে বিপ্লবের প্রথম পাঠ তিনিই পড়িয়ে ছিলেন। আর তাঁর মেয়েই হল এই আততায়ী(?) নাম বীনা দাস। যুগান্তর দলের সদস্য ছিলেন। ঘটনার পর কী ঘটল?
১৯১১র চরম মুহূর্ত। চাপের মুখে নতিস্বীকার করে ইংরেজ শাসক রদ করতে বাধ্য হয়েছে বঙ্গভঙ্গ- র চক্রান্ত। সেই সালেই জন্ম বীনা দাসের। ছোট থেকে বিপ্লবী ধারায় শিক্ষিত। বাবা সুভাষ বোস-র গুরু। সেই আদর্শই তাঁর ধমনীতে বইছে। কিশোরী বয়সেই দিদি কল্যানী দাস কে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখেন। কলকাতা ছাত্রসংঘের অন্যতম সংগঠক ছিলেন কল্যাণী দাস।
বিপ্লবীদের গোপন সভায় যোগ দিতেন কল্যাণী। এমনই এক সভাতে, সঙ্গে প্রচারের লিফলেট থাকায় তাঁকে গ্রেফতার করেছিল ইংরেজ পুলিশ। কল্যাণীর কারাবাসের দিনগুলিতে অবর্ণনীয় কষ্ট পাওয়া নিজের মধ্যে অনুভব করেন বীণা দাস। সেখান থেকেই শুরু তাঁর বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষা। আর তাই ইংরেজদেরকে উচিত শিক্ষা দিতে চুলের খোঁপায় পিস্তল নিয়ে গেছিলেন তিনি সেই সভায়, যেখানে তাঁরও সম্মাননা পাওয়ার কথা। কী হল এরপর?
জেরায় জেরায় জেরবার করে দিল লালমুখো পুলিশ অফিসার এবং 'নেটিভ' পুলিশ। নাহ! কিচ্ছু স্বীকার করলেন না একুশ বছরের এই 'অগ্নিকন্যা'। বেণীমাধব দাসকে পুলিশ একরকম শাসালো-'মেয়ে কে মুখ খুলতে বলুন।' কিন্তু তারা বেণীমাধব দাসকে ঠিক চেনেনি। সোজাসুজি না করে দিলেন তিনি। ইংরেজদের মুখে মেয়ের পর 'দ্বিতীয় থাপ্পড়'টা দিলেন বাবা! বিচারে ন'বছরের কারাবাস পেলেন বীনা। তবে মহাত্মা গান্ধীর তদবিরে সাত বছরের মেয়াদ শেষেই মুক্তি পান বীনা দাস। তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী ছিল?
জেল থেকে ছাড়া পেলেও বীণা দাস সংগ্রাম থামালেন না। ইতোমধ্যে সশস্ত্র বিপ্লবীদের অনেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথে চলে যান। বীণা দাস সেই মত গ্রহণ করেন। তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন এবং শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। বস্তিবাসী দরিদ্র শ্রমিক পরম মমতায় আগলে রেখে ছিলেন। ১৯৪২; ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন বীনা। দক্ষিণ কলকাতার হাজরা পার্কের এক সভা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছিল। ফের হাজত বাস!রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে ১৯৪৫ সালে মুক্তি পান। মুক্তির পর কী করলেন তিনি?
স্বাধীনতার পর কংগ্রেস সদস্য হিসেবে প্রাদেশিক সভার নিম্নকক্ষে জিতেছিলেন বীনা দাস। তবে আর কখনও নির্বাচনে অংশ নেননি তিনি। 'উদ্বাস্তু আন্দোলন' এবং 'সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা' আন্দোলনে উজ্জ্বল মুখ ছিলেন তিনি। স্কুলে ইংরেজির শিক্ষয়ত্রী ছিলেন বীনা দাস। ১৯৬০ সালে সমাজসেবায় অবদানের জন্য পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হন। ২৬শে ডিসেম্বর ১৯৮৬; শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েন দৃঢ়চেতা এই বিপ্লবী!
এই স্বাধীনতা দিবসে আমরা কি যথার্থ মনে রেখেছি তাকে?