কলকাতা: ফেসবুক বা অন্য কোনও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জাতিগত পরিচয় নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করলেও তার আইনি পরিণতি হতে পারে। শুধু সামনাসামনি জাত তুলে গালিগালাজ করলেই আইন প্রযোজ্য হবে—এমন নয়। ডিজিটাল মাধ্যমে করা মন্তব্যও তফসিলি জাতি ও উপজাতি (SC/ST) সুরক্ষা আইনের আওতায় বিচারযোগ্য হতে পারে বলে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল কলকাতা হাইকোর্ট।
একটি মামলার শুনানিতে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে বিচারপতি উদয় কুমারের বেঞ্চ। একইসঙ্গে আদালত জানিয়ে দিয়েছে, ফেসবুক বা মেটার কাছ থেকে ব্যবহারকারীর তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া যায় না।
মামলার সূত্রে জানা যায়, অভিযোগকারী রবিউল ইসলাম বুলবুল এবং সয়ন দত্ত নামে দু’জনের বিরুদ্ধে ফেসবুকে তাঁর জাতিগত পরিচয়, ধর্ম এবং পরিবারকে নিয়ে আপত্তিকর ও জাতিবিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ তোলেন। অভিযোগের সমর্থনে তিনি সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট এবং ডিজিটাল লিঙ্কও পুলিশের কাছে জমা দেন। এরপর বেহালা থানায় SC/ST আইনের ৩(১)(আর)/(এস) ধারায় মামলা দায়ের হয়।
তদন্তের সময় পুলিশ অভিযোগকারীর বক্তব্য রেকর্ড করে এবং বিভিন্ন স্ক্রিনশট ও ডিজিটাল লিঙ্কের তথ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু তদন্তকারী সংস্থা পরবর্তীতে ‘নিল’ বা ‘নো ক্লু’ রিপোর্ট জমা দেয়। পুলিশের দাবি ছিল, সাইবার সেলের মাধ্যমে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও সেই তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০২৩ সালের ২৭ জুন আলিপুরের বিশেষ আদালত পুলিশের সেই রিপোর্ট গ্রহণ করে অভিযোগকারীর আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অভিযোগকারী।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, কোনও মামলায় ডিজিটাল প্রমাণ, স্ক্রিনশট এবং লিঙ্ক থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া যায় না। প্রতিটি ফৌজদারি মামলাকে তার নিজস্ব তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে।
আদালত আরও জানায়, প্রয়োজনে আইপি লগ, প্রোফাইল সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। সাইবার-ফরেনসিক পদ্ধতিতে তদন্তের আরও সুযোগ ছিল বলেও আদালত মনে করেছে।
এই পর্যবেক্ষণের পর ২০২৩ সালের ২৭ জুনের বিশেষ আদালতের নির্দেশ বাতিল করে দেয় হাইকোর্ট। পাশাপাশি অভিযোগে উল্লেখ থাকা অপরাধমূলক পোস্টগুলির ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ও সংশ্লিষ্ট প্রোফাইল লগ শনাক্ত করতে সাইবার-ফরেনসিক কর্মী নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে, এই রায়ের পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(৮) ধারার অধীনে তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে।
ফলে এই মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের বার্তা স্পষ্ট,সোশ্যাল মিডিয়ায় জাতিগত অপমানের অভিযোগকে শুধুমাত্র অনলাইন পোস্ট বলে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। ডিজিটাল প্রমাণ থাকলে তার যথাযথ তদন্তও প্রয়োজন।
