ছত্রপতি সম্ভাজিনগর, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: একটি পাহাড়। এক কিশোর। আর তাকে বাঁচাতে গিয়ে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নিঃশেষ হয়ে গেল একটি পরিবার। মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের খভড্যা ডোঙ্গরে ১৮ বছরের কুণাল চাঁদগুড়ে, তাঁর বাবা মুরলিধর এবং মা সঙ্গীতার মৃত্যুর ঘটনায় যত সময় গড়াচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন তথ্য। ঘটনার আগের দিনই ইউটিউবে সম্পর্ক এবং তার মূল্য নিয়ে একটি ভিডিয়ো করেছিলেন সঙ্গীতা। পর দিনই সেই পাহাড়ে ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকেই বার বার ফিরে আসার অনুরোধ করতে দেখা গেল মাকে। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু হল বাবা-মায়েরও।
শুক্রবার সকাল ১০টা নাগাদ ঘটনার সূত্রপাত। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নতুন কেনা মোবাইলের কিস্তির টাকা দেওয়া নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কুণালের বচসা হয়েছিল। তার পরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে খভড্যা ডোঙ্গরে চলে যান তিনি। পাহাড়ের কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কুণাল। খবর পেয়ে ছুটে যান বাবা-মা। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা, সরপঞ্চ, পুলিশ এবং উদ্ধারকারী দলের সদস্যেরাও। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা চলে।
সেই সময়ের একটি ভিডিয়ো এখন সামনে এসেছে। পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে কুণাল। কয়েক হাত দূরে বসে কাঁদছেন তাঁর মা। কখনও হাতজোড় করছেন, কখনও ছেলের কাছে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এক পর্যায়ে তাঁকে হাঁটু গেড়ে ছেলের কাছে ফিরে আসার অনুরোধ করতেও দেখা যায়। আশপাশের লোকজনও বার বার বলছিলেন, ‘‘মায়ের কথা ভাবো, ফিরে এসো।’’ কিন্তু কোনও কথাতেই নড়েননি কুণাল।
স্থানীয় সরপঞ্চ সঞ্জয় যাদবও দীর্ঘক্ষণ কুণালের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে এমনকি তাঁকে আইফোন দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। কিন্তু কুণাল নাকি জানিয়ে দেন, ‘‘এখন আর কোনও সমাধান নেই।’’ তার পরেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর ছেলে যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, সেখানে পৌঁছন মুরলিধর। ছেলেকে টেনে নিরাপদ জায়গায় আনার চেষ্টা করেন তিনি। সেই সময়ই দু’জনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। বাবা ও ছেলে একসঙ্গে গভীর খাদে পড়ে যান। ঘটনাটি চোখের সামনে দেখে সঙ্গীতাও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে খাদে ঝাঁপ দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। তিন জনেরই মৃত্যু হয়।
কিন্তু এই মর্মান্তিক ঘটনার ঠিক আগের দিন কী বলেছিলেন সঙ্গীতা? বৃহস্পতিবার নিজের ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেছিলেন তিনি। সেখানে সম্পর্কের মূল্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল—যে মানুষ ভালবাসার মূল্য বোঝেন না, তাঁর জন্য নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কোনও অর্থ নেই। সম্পর্ক তখনই টেকে, যখন দু’দিক থেকেই সমান ভালবাসা, সম্মান এবং গুরুত্ব থাকে। একতরফা সম্পর্কের অর্থ নেই—এমনই বার্তা দিয়েছিলেন তিনি।
সঙ্গীতা নিয়মিত ইউটিউবে নানা ‘মোটিভেশনাল’ ভিডিয়ো প্রকাশ করতেন। তাঁর চ্যানেলে ২৯ হাজারেরও বেশি অনুসারী ছিল। সেখানে ছেলে কুণালকে নিয়েও একাধিক ভিডিয়ো রয়েছে। একটি ভিডিয়োয় মা-ছেলেকে একসঙ্গে চা খেতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিয়োয় কুণালকে মায়ের পা ধুয়ে আশীর্বাদ নিতে দেখা গিয়েছে। সেই ভিডিয়োগুলি এখন আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনার পর তাই শুধু ‘মোবাইলের কিস্তি নিয়ে অশান্তি’কেই কারণ হিসাবে দেখছে না পুলিশ। পরিবারের পুরনো অশান্তি, কুণালের মানসিক অবস্থার পাশাপাশি সঙ্গীতার ভিডিয়োগুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জানা গিয়েছে, প্রায় ছয় বছর আগে পরিবারের আর এক ছেলের অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারে নানা টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। তবে সেই পুরনো ঘটনার সঙ্গে শুক্রবারের মৃত্যুর সরাসরি যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
একটি ভিডিয়োতে মা বলছেন, সম্পর্কের দুই দিকেই যদি ভালবাসা না থাকে, তবে সেই সম্পর্কের কোনও মূল্য নেই। তার মাত্র এক দিন পর সেই মাকেই পাহাড়ের কিনারায় ছেলের সামনে কাঁদতে দেখা গেল। ছেলেকে ফেরাতে পারলেন না। বরং ছেলেকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় স্বামীকে হারালেন, তার পর নিজেও চলে গেলেন। খভড্যা ডোঙ্গরের সেই কয়েক ঘণ্টার ঘটনা তাই এখন শুধু একটি পরিবারের করুণ পরিণতির কাহিনি নয়, মানসিক চাপ, পারিবারিক টানাপড়েন এবং মুহূর্তের সিদ্ধান্ত কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তারও মর্মান্তিক উদাহরণ।