সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। রাস্তায় মানুষ, দোকানপাট খুলছে, বাড়িতে ব্যস্ততা। ঘড়ির কাঁটা তখন স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিট। আচমকাই কেঁপে উঠল মাটি। প্রথমে হালকা, তার পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রবল কম্পন। বাড়ির জানলা-দরজা দুলতে শুরু করল। কোথাও দেওয়ালে ফাটল, কোথাও ছাদ ভেঙে পড়ল। আর কোথাও গোটা বাড়িটাই হুড়মুড়িয়ে চলে গেল ধ্বংসস্তূপের নীচে।
সোমবার, ১০ অগস্ট পশ্চিম কলম্বিয়ায় আছড়ে পড়া ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে মঙ্গলবার পর্যন্ত অন্তত ১৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫৭০ জনেরও বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১,৬০০টি বাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা। তার মধ্যে অন্তত ৬১টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে। ফলে মৃত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রশাসনের।
কাঁপল বহু শহর
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা USGS-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল পশ্চিম কলম্বিয়ার চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার এলাকার কাছে। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে ছিল কম্পনের উৎস। কেন্দ্রের কাছাকাছি হওয়ায় চোকো প্রদেশে অভিঘাত ছিল প্রবল। তবে কম্পন ছড়িয়ে পড়ে আরও বিস্তীর্ণ এলাকায়। কালি, পেরেইরা-সহ একাধিক শহরে মানুষ আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন। বোগোতা পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের কেন্দ্র তুলনামূলক গভীরে হওয়ায় কম্পনের বিস্তার অনেক দূর পর্যন্ত অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা শহরগুলিতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়লেন অনেকে
কম্পন থামার পরই শুরু হয় আসল লড়াই। কোথায় বাড়ির নীচে কেউ আটকে, কোথায় ভেঙে পড়া দেওয়ালের তলায় নিখোঁজ মানুষ—খবর আসতে থাকে একের পর এক। সেনা, পুলিশ, দমকল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা নামেন উদ্ধারকাজে। তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান স্থানীয় বাসিন্দারাও। ধ্বংসস্তূপের নীচে জীবিত কাউকে খুঁজে পেতে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুর। কোনও জায়গায় হাত দিয়ে, কোনও জায়গায় ভারী যন্ত্র দিয়ে সরানো হচ্ছে কংক্রিটের স্তূপ। উদ্ধারকারীদের কাছে প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সময়ের সঙ্গে দ্রুত কমতে থাকে।
শুধু বাড়ি নয়, বিপর্যস্ত হাসপাতাল-স্কুলও
ক্ষয়ক্ষতির ছবিটা শুধু ধসে পড়া বাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ১,৫৭৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ১৮টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৫২টি স্কুলের। অর্থাৎ যে সময়ে আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই সময়েই স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত। স্কুলগুলির ক্ষয়ক্ষতির ফলে বহু পড়ুয়ার পড়াশোনাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কোথাও ভবন নিরাপদ কি না, তা পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। প্রশাসনের সামনে তাই একই সঙ্গে উদ্ধার, চিকিৎসা, আশ্রয় এবং শিক্ষা—একাধিক চ্যালেঞ্জ।
৬১টি ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে
প্রাথমিক হিসাবেই অন্তত ৬১টি ভবন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। আরও বহু বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। কোথাও দেওয়াল ফেটে গিয়েছে, কোথাও ছাদে বড়সড় চিড়। ভূমিকম্পের পরেও এই ধরনের বাড়িতে ঢোকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ মূল কম্পনের পরে দুর্বল কাঠামো আচমকাই ভেঙে পড়তে পারে। এই কারণেই উদ্ধারকর্মীরা শুধু ধ্বংসস্তূপ সরাচ্ছেন না, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলির নিরাপত্তাও পরীক্ষা করছেন। কতগুলি বাড়ি মেরামত করে ব্যবহার করা যাবে আর কতগুলি ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হবে—সেই হিসাবও শুরু হয়েছে।
২১ বার আফটারশক, কাটেনি আতঙ্ক
মূল ভূমিকম্পের পরেই শেষ হয়নি বিপদ। রিপোর্ট অনুযায়ী, তার পর কমপক্ষে ২১টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। ফলে আতঙ্কে বহু মানুষ বাড়িতে ফিরতে চাইছেন না। যেসব বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে, সেগুলিতে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
আফটারশকের অভিঘাতে আগে থেকেই দুর্বল হয়ে যাওয়া কোনও ভবন আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রশাসনের তরফে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে—ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত না ঢোকার জন্য।
ভাইরাল ভিডিয়োয় ধরা পড়ল কয়েক সেকেন্ডের আতঙ্ক
ভূমিকম্পের ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োগুলিতে। কোনও ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, কম্পনের মধ্যে মানুষ দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছেন। কোথাও দেখা যাচ্ছে, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি ভবনের অংশ ভেঙে পড়ছে। ধুলোর মেঘে ঢেকে যাচ্ছে রাস্তা। আবার কোথাও আতঙ্কে মানুষ চিৎকার করে নিরাপদ জায়গায় ছুটছেন।
আরও কিছু ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, বিমানবন্দর ও অন্যান্য পরিকাঠামোতেও ক্ষয়ক্ষতির ছবি। কম্পনের সময় ভবনের ভিতরে থাকা মানুষ কী ভাবে প্রাণ বাঁচাতে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন, সেই ছবিও সামনে এসেছে।
ছয় বিমানবন্দরেও ক্ষতি, ব্যাহত যোগাযোগ
ভূমিকম্পের অভিঘাত যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, একাধিক রাস্তার ক্ষতি হয়েছে এবং ছয়টি বিমানবন্দরেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গিয়েছে। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দল পৌঁছনো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। চোকো এমনিতেই কলম্বিয়ার অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এবং দুর্গম অঞ্চলগুলির অন্যতম। ফলে রাজধানী বা বড় শহরের তুলনায় দ্রুত উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া সেখানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জরুরি অবস্থার ঘোষণা
ভূমিকম্পের পর জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে কলম্বিয়া সরকার। সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের একা ছেড়ে দেওয়া হবে না। উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সেনা এবং পুলিশকে পূর্ণ শক্তি নিয়ে নামানো হয়েছে। ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলিকে সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার। বিশেষ করে চোকো প্রদেশের মতো দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন ও পরিকাঠামোগত সমস্যায় থাকা এলাকায় পুনর্গঠন দ্রুত শুরু করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক সাহায্যের হাতও বাড়ছে
কলম্বিয়ার ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর আন্তর্জাতিক মহল থেকেও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এসেছে। আমেরিকা জরুরি সহায়তা হিসাবে ১৫.৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার ঘোষণা করেছে। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশও সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে উদ্ধার ও চিকিৎসাই অগ্রাধিকার। কিন্তু এর পরেই শুরু হবে পুনর্বাসন। হাজার হাজার মানুষ যদি বাড়ি হারিয়ে থাকেন, তাঁদের অস্থায়ী আশ্রয়, খাবার, পানীয় জল এবং চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
কেন এত ভূমিকম্পপ্রবণ কলম্বিয়া?
কলম্বিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটিকে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রেখেছে। দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে নাজকা প্লেট দক্ষিণ আমেরিকা প্লেটের নীচে ঢুকে যাওয়ার ফলে ওই অঞ্চলে ভূগর্ভে দীর্ঘদিন ধরে চাপ তৈরি হয়। সেই চাপের হঠাৎ মুক্তিই বড় ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে। অর্থাৎ ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কলম্বিয়া এবং আন্দিজ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশই ভূমিকম্পপ্রবণ। এ বারও ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে ভূতাত্ত্বিক গতিবিধি সক্রিয়।
শুধু ৭.৪ মাত্রাই কি বিপদের কারণ?
একটি ভূমিকম্পের মাত্রা যত বেশি, বিপদের সম্ভাবনা তত বেশি—এটা ঠিক। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে আরও অনেক কিছুর উপর। ভূমিকম্পের গভীরতা, কেন্দ্র থেকে জনবসতির দূরত্ব, মাটির প্রকৃতি, ভবনের বয়স এবং নির্মাণের মান—সবই গুরুত্বপূর্ণ। চোকো অঞ্চলের দুর্গমতা এবং তুলনামূলক দুর্বল পরিকাঠামো উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্প উন্নত পরিকাঠামোযুক্ত কোনও এলাকায় যতটা ক্ষতি করত, এখানে তার অভিঘাত আলাদা হতে পারে।
ধ্বংসস্তূপ সরলেই শেষ নয়, সামনে আরও বড় লড়াই
ভূমিকম্প থেমে গিয়েছে। কিন্তু বিপর্যয় এখনও শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নীচে নিখোঁজ মানুষদের খোঁজ, আহতদের চিকিৎসা, ঘরহারা পরিবারগুলির আশ্রয়, ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল-হাসপাতাল ফের চালু করা—একসঙ্গে এগোতে হবে সব কাজ। প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা উদ্ধার অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার পর শুরু হবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ সমীক্ষা। কোন বাড়ি মেরামত করা সম্ভব, কোনটি ভেঙে ফেলতে হবে, কোথায় নতুন করে রাস্তা তৈরি করতে হবে—ধীরে ধীরে সামনে আসবে সেই হিসাব।
আর সেই হিসাব যতই বাড়বে, ততই স্পষ্ট হবে ১০ অগস্টের সেই সকালটি কলম্বিয়ার জন্য কত বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। ৭.৪ মাত্রার কয়েক মিনিটের কম্পন শুধু ১৩২টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি; কাঁপিয়ে দিয়েছে একটি দেশের পরিকাঠামো, প্রশাসন এবং হাজার হাজার পরিবারের ভবিষ্যৎ।