অঞ্জাও, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: দেশের অন্য প্রান্ত তখনও গভীর ঘুমে। শহরের আলো নিভে আসছে। আকাশে রাতের শেষ অন্ধকার। আর ঠিক তখনই পাহাড়ের গায়ে ফুটে উঠছে সোনালি আলো। সূর্যের প্রথম কিরণ এসে পড়ছে ভারতের মাটিতে। সেই দৃশ্য দেখতে হলে যেতে হবে অরুণাচল প্রদেশের প্রত্যন্ত ডং গ্রামে। অঞ্জাও জেলার এই ছোট্ট পাহাড়ি জনপদকেই ভারতের অন্যতম প্রথম সূর্যোদয় দেখার জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভারতের পূর্ব প্রান্তে অবস্থানের কারণেই ডংয়ে দেশের বেশির ভাগ জায়গার তুলনায় অনেক আগে ভোর হয়। শীতকালে কখনও কখনও ভোর সাড়ে চারটে নাগাদই সূর্যের আলো দেখা যায় বলে পর্যটন-তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। গ্রীষ্মে সময় আরও এগিয়ে যেতে পারে। তবে ঠিক কখন সূর্যোদয় হবে, তা ঋতু, আবহাওয়া এবং পাহাড়ের অবস্থানের উপর নির্ভর করে।
চিন-Myanmar সীমান্তের কাছে ছোট্ট গ্রাম
ডং অবস্থিত অরুণাচল প্রদেশের অঞ্জাও জেলায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা প্রায় ১,২৪০ মিটার। এক দিকে পাহাড়, অন্য দিকে ঘন পাইন বন, নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে লোহিত নদী। কাছেই ওয়ালং। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওয়ালং থেকে ডংয়ের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। তবে ডংয়ের আসল আকর্ষণ শুধু সূর্যোদয় নয়। এই এলাকা ভারত, চিন এবং মায়ানমারের সীমান্তঘেঁষা দুর্গম ভূখণ্ডের অংশ। পাহাড়ি নীরবতা, মেঘে ঢাকা উপত্যকা, পাইনবন এবং লোহিত নদীর মিলনে জায়গাটির পরিবেশ একেবারেই অন্য রকম।
সূর্য দেখতে রাতেই বেরোতে হয়!
ডংয়ের সূর্যোদয় দেখতে চাইলে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের বারান্দায় দাঁড়ালেই হবে না। অনেক পর্যটককে গভীর রাতে যাত্রা শুরু করতে হয়। পাহাড়ি পথ ধরে নির্দিষ্ট ভিউপয়েন্টে পৌঁছতে হয় সূর্য ওঠার আগেই। সরকারি পর্যটন তথ্যেও ভোরের আগে পাহাড়ি পথে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্ধকার পাহাড়ি পথ। চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে পাহাড়ের কালো অবয়ব। তারপর ধীরে ধীরে আকাশের রং বদলাতে শুরু করে। প্রথমে নীলচে অন্ধকারের মধ্যে হালকা লাল আভা। তার পর পাহাড়ের মাথায় সোনালি রেখা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সূর্যের আলোয় বদলে যায় গোটা উপত্যকা। এই কারণেই ডংয়ের সূর্যোদয় শুধু একটি ‘সানরাইজ স্পট’ নয়, অনেকের কাছে এটি একটি অভিজ্ঞতা।
২০০০ সালের ‘মিলেনিয়াম সানরাইজ’
ডংয়ের সূর্যোদয় নিয়ে মানুষের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। সরকারি অঞ্জাও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি ‘মিলেনিয়াম সানরাইজ’ দেখতে দেশ-বিদেশের বহু মানুষ ডংয়ে পৌঁছেছিলেন। সেই ঘটনার পর জায়গাটির পরিচিতি আরও ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকেই ধীরে ধীরে পর্যটকদের কাছে ডং পরিচিত হয়ে ওঠে ভারতের প্রথম সূর্যোদয়ের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে।
শুধু সূর্য নয়, পাহাড়ি জনজীবনও টানে
ডংয়ের আশপাশে রয়েছে মেয়ার ও মিশমি জনগোষ্ঠীর বসতি। পাহাড়ি জনজীবন, স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার এবং ঐতিহ্যও পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। ফলে সূর্যোদয় দেখার পাশাপাশি অরুণাচলের সীমান্তবর্তী এলাকার জীবনযাত্রার সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে।
এই এলাকাকে ঘিরে পর্যটন বাড়ানোর উদ্যোগও শুরু হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে ডংয়ে প্রথম ‘সান রাইজ ফেস্টিভ্যাল’-এর আয়োজন করে অরুণাচল প্রদেশ পর্যটন দফতর। সূর্যোদয়ের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতি, নৃত্য, খাবার এবং অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনকে সামনে আনা হয়েছে এই উৎসবে।
কী ভাবে যাবেন?
ডং পৌঁছনোর পথ অবশ্য একেবারেই সহজ নয়। নিকটবর্তী গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশন নিউ তিনসুকিয়া। বিমানপথে তেজু বা অসমের ডিব্রুগড় হয়ে সড়কপথে যেতে হয়। এরপর পাহাড়ি রাস্তা ধরে ওয়ালং। সেখান থেকে ডং। অঞ্জাও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ওয়ালং থেকে ডং প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে।
অরুণাচল প্রদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ম মেনে চলা জরুরি। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এই এলাকায় যাত্রার আগে স্থানীয় পরিস্থিতি, রাস্তার অবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়াই ভাল।
শহরের ভিড় থেকে বহু দূরে
ডংয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্ভবত তার নির্জনতাই। এখানে বড় শহরের কোলাহল নেই, নেই পর্যটনকেন্দ্রের চেনা ভিড়। আছে পাহাড়, বন, নদী আর ভোরের সেই প্রথম আলো। ভারতের এক প্রান্তে যখন রাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা, তখন দেশের এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামটি নতুন দিনের প্রথম অভ্যর্থনা জানায়।
তাই যাঁরা প্রচলিত দার্জিলিং, সিকিম বা মানালির বাইরে একটু অন্য রকম পাহাড় খুঁজছেন, তাঁদের কাছে ডং হয়ে উঠতে পারে একেবারে অন্য অভিজ্ঞতা, যেখানে সূর্যোদয় শুধু দেখা যায় না, মনে হয় দেশের নতুন দিনের প্রথম সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি।