দুর্গাপুর: সামনে পুরোহিত। পাশে ধান, ডিম, কলা। পড়ে রয়েছে বালি ও কয়লা। মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে জ্বলছে আগুন। আর সেই আগুনকে ঘিরেই উঠছে স্লোগান—‘বল হরি, হরি বোল’। তবে কোনও মানুষের শ্রাদ্ধ নয়। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে তৃণমূল কংগ্রেসের পুরনো নাম ও প্রতীক ব্যবহারে আপাতত নিষেধাজ্ঞার ঘটনাকে সামনে রেখে এ বার প্রকাশ্যেই ‘তৃণমূলের শ্রাদ্ধ’ করল বিজেপি।
শনিবার দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারে আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের ভবনের সামনে এই কর্মসূচি ঘিরে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত হয়। পুরোহিতের উপস্থিতিতে শুরু হয় প্রতীকী শ্রাদ্ধের আচার। একের পর এক ধর্মীয় রীতি পালনের পর জ্বালানো হয় আগুন। বিজেপির বক্তব্য, এই কর্মসূচির মাধ্যমে তারা তৃণমূলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে নিজেদের বার্তা দিতে চেয়েছে। যদিও তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এখনও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে।
বিজেপির এই কর্মসূচির নেপথ্যে রয়েছে তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। দলের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ, নাম ও নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে বিরোধের জেরে ১৭ সেপ্টেম্বর কমিশন ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ঐতিহ্যবাহী ‘ফুল-ঘাস’ প্রতীক ব্যবহারে অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অর্থাৎ আসন্ন উপনির্বাচনে কোনও গোষ্ঠীই আপাতত পুরনো নাম ও প্রতীক নিয়ে লড়তে পারবে না।
পরের দিন, ১৮ সেপ্টেম্বর, উপনির্বাচনের জন্য দুই গোষ্ঠীকে পৃথক নাম ও প্রতীকও দেয় কমিশন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী পেয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক। প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘খাম’ প্রতীক। এই নাম ও প্রতীকগুলি আপাতত উপনির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসাবেই কার্যকর।
সেই সিদ্ধান্তের পরেই রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা আরও তীব্র হয়েছে। দুর্গাপুরে শনিবার তারই নাটকীয় প্রকাশ দেখা গেল। শ্রাদ্ধের সামগ্রী হিসাবে ধান, ডিম, কলা, বালি এবং কয়লা রাখা হয়। বিজেপির দাবি, এই উপকরণগুলির প্রত্যেকটির পিছনে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য রয়েছে। মন্ত্রোচ্চারণের পর আগুন জ্বালিয়ে প্রতীকী ‘শেষকৃত্য’ এবং তার পরে শ্রাদ্ধ-শান্তির আয়োজন করা হয়।
কর্মসূচিতে উপস্থিত বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মুখেও ওঠে ‘বল হরি, হরি বোল’ স্লোগান। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে ঘিরে তৈরি হওয়া তৃণমূলের নাম-প্রতীক সঙ্কটকেই রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার করে তুলতে চেয়েছে বিজেপি। দলের জেলা মুখপাত্র সুমন্ত মণ্ডল বলেন, “এখনও তৃণমূল প্রেতাত্মা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষ বেলায় ডিম খেয়েছে অনেক, সেই জন্য আমরা ডিম রেখেছি। আর এক সময় বালি, কয়লা সব খেয়েছে। তাই শ্রাদ্ধ করার পর একেবারে বিসর্জন দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। এই সমস্ত সামগ্রী রেখে আমরা তৃণমূলকে শেষ বিদায় জানালাম।”
তবে কমিশনের সিদ্ধান্তকে তৃণমূলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের চূড়ান্ত অবসান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কমিশনের ১৭ সেপ্টেম্বরের নির্দেশ ছিল অন্তর্বর্তী। পরবর্তী ব্যবস্থায় দুই গোষ্ঠীকে আলাদা নাম ও প্রতীক দিয়ে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে। মূল নাম ও প্রতীকের দাবির বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
এই পরিস্থিতিতেই আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। ফলে তৃণমূলের পুরনো নাম ও প্রতীক ঘিরে লড়াই এখন শুধু রাজনৈতিক ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই; তা গড়িয়েছে আদালতেও।
এক দিকে আদালতে নাম-প্রতীক ফিরে পাওয়ার লড়াই, অন্য দিকে সেই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাস্তায় রাজনৈতিক প্রচার। দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারে শনিবারের ‘শ্রাদ্ধ’ কর্মসূচি সেই দ্বিমুখী সংঘাতেরই দৃশ্যমান প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল।