কলকাতা: সরকারি জমি ঠিক কতটা? নথিতে যে জমি সরকারের নামে রয়েছে, বাস্তবে তার কতটা সরকারের দখলে আর কতটাই বা চলে গিয়েছে বেদখলে? এ বার সেই হিসাবই কষতে রাজ্যজুড়ে বড়সড় সমীক্ষায় নামছে নবান্ন। শুধু কাগজে-কলমে নয়, সরেজমিনে গিয়ে প্রতিটি জমির অবস্থান, আয়তন এবং সীমানা চিহ্নিত করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী জমির চারপাশে বসানো হবে স্থায়ী সীমানা-খুঁটি বা পিলারও।
নবান্ন সূত্রে খবর, রাজ্যের বিভিন্ন দফতর এবং সরকারি সংস্থার হাতে থাকা জমি ছড়িয়ে রয়েছে নানা প্রান্তে। কোথাও রয়েছে সরকারি অফিস বা পরিকাঠামো, কোথাও আবার জমি দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা। নথিতে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে সেই জমির একটি অংশের দখল নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কোথাও জমি বেদখল হয়েছে, কোথাও আবার সরকারি জমির সীমানা নিয়েই স্পষ্টতা নেই। সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যেই এই সমীক্ষার উদ্যোগ।
শুধু জমি নয়, মাপজোক হবে রাস্তা-খাল-বাঁধেরও
এই সমীক্ষার পরিধি শুধু সরকারি প্লটেই আটকে থাকছে না। রাজ্যের বিভিন্ন রাস্তা, রেললাইন, খাল এবং বাঁধের রেখাও নিখুঁত ভাবে মেপে নথিভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি সম্পত্তির অবস্থান এবং সীমানা নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে বিতর্ক বা দখলের সুযোগ কমে, তার জন্য একটি বিস্তারিত নথি তৈরি করতে চাইছে রাজ্য।
প্রতিটি জমির বর্তমান পরিস্থিতির পাশাপাশি তার সঠিক অবস্থান এবং সীমানা নির্ধারণ করা হবে। পরে সেই তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে মানচিত্র ও নকশা। কোনও জমি যদি সরকারের দখলের বাইরে চলে গিয়ে থাকে, সমীক্ষার রিপোর্টে তার অবস্থানও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে হবে সমীক্ষা
এই কাজ শুধু প্রচলিত মাপজোকের উপর নির্ভর করে করার পরিকল্পনা নেই। ইলেকট্রনিক টোটাল স্টেশন এবং গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেমের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা জানিয়েছে রাজ্যের ল্যান্ড রেকর্ডস অ্যান্ড সার্ভে ডিরেক্টরেট। ইতিমধ্যেই সমীক্ষার কাজে বিশেষজ্ঞ সংস্থা নিয়োগের জন্য দরপত্র ডাকা হয়েছে।
সমীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে প্রয়োজনে জমির সীমানা চিহ্নিত করে সেখানে স্থায়ী পিলার বসাতেও হবে। ফলে ভবিষ্যতে কোনও জমি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নথির পাশাপাশি মাঠে থাকা সীমানা-চিহ্নও সরকারের সম্পত্তি চিহ্নিত করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
তবে কি পরের ধাপ দখলমুক্তি?
এই উদ্যোগ ঘিরেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সরকারি জমির নিখুঁত হিসাব তৈরি হওয়ার পর কি শুরু হবে দখলমুক্তির অভিযান?
সরকারি ভাবে আপাতত সমীক্ষার উদ্দেশ্য জমির সঠিক অবস্থান, আয়তন এবং সীমানা নির্ধারণ। কিন্তু এই কাজের ফলেই রাজ্যের হাতে প্রথম বার বহু সরকারি জমির বর্তমান অবস্থার একটি বিস্তারিত ছবি চলে আসতে পারে। ফলে কোথায় সরকারি জমি বেদখল হয়ে রয়েছে, কোথায় সীমানা নিয়ে সমস্যা এবং কোথায় জমি এখনও সরকারের নিয়ন্ত্রণে—সবটাই আলাদা করে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
সেখান থেকেই ভবিষ্যতে জমি পুনরুদ্ধারের পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে। কারণ, সরকারি জমি দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে অতীতে প্রশাসনিক অভিযান হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। এ বার গোটা রাজ্যের সরকারি জমিকে একই মাপকাঠিতে এনে তার হিসাব তৈরির উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকেই ফের সামনে এনে দিয়েছে।
কয়েক মাসের মধ্যেই নকশা হাতে চায় নবান্ন
রাজ্যের লক্ষ্য, দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত সমীক্ষার কাজে নামা এবং কয়েক মাসের মধ্যেই তার ফল হাতে পাওয়া। সমীক্ষা শেষ হলে শুধু জমির পরিমাণ নয়, তার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তারিত তথ্যভাণ্ডার তৈরি হবে।
অর্থাৎ এত দিন নথির পাতায় ছড়িয়ে থাকা সরকারি জমির হিসাব এ বার মাঠের বাস্তব ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাইছে রাজ্য। কোথায় সরকারের জমি, কোথায় তার সীমানা, কোথায় দখল—সব কিছুর ‘ম্যাপ’ তৈরি হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার পথও অনেকটাই পরিষ্কার হবে। আর সেই কারণেই নবান্নের এই জমি-সমীক্ষা ঘিরে এখন নজর—এটি কি শুধু জমির হিসাব তৈরির অভিযান, নাকি তার পরেই শুরু হবে সরকারি জমি পুনরুদ্ধারের বড় পদক্ষেপ?
