বিশেষ প্রতিবেদন: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আমরা সাধারণত বিধবা বিবাহ আন্দোলন, বর্ণপরিচয় কিংবা সমাজসংস্কারের সঙ্গে মনে করি। কিন্তু তাঁর কর্মজীবনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল নারীশিক্ষার প্রসার। উনিশ শতকের বাংলায় যখন মেয়েদের শিক্ষাকে অনেক পরিবারই অপ্রয়োজনীয়, এমনকি সমাজবিরোধী বলেও মনে করত, তখন বিদ্যাসাগর বিশ্বাস করতেন একটি সমাজকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিতে হলে তার নারীদের শিক্ষিত করতেই হবে। তাঁর কাছে নারীশিক্ষা ছিল কেবল বই পড়তে শেখার বিষয় নয়; এটি ছিল আত্মমর্যাদা, সচেতনতা ও স্বাধীন চিন্তার পথ।
নারীশিক্ষার পথে এক কঠিন সময়
উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক বাস্তবতা আজকের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। অধিকাংশ মেয়ের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। বাল্যবিবাহ, সামাজিক কুসংস্কার এবং রক্ষণশীল মানসিকতার কারণে বহু পরিবার মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইত না। অনেকের ধারণা ছিল, মেয়েরা পড়াশোনা করলে সংসারের প্রচলিত কাঠামো নষ্ট হবে।
এই পরিস্থিতিতেই বিদ্যাসাগর সামনে এগিয়ে আসেন। তিনি বুঝেছিলেন, কেবল সমাজকে বক্তৃতা দিয়ে বোঝালেই পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ বিদ্যালয় তৈরি করা, শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং অভিভাবকদের সেই শিক্ষার প্রতি আস্থা তৈরি করা।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় উদ্যোগ
নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তোলার কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিক্ষার্থী সংগ্রহ, অর্থের ব্যবস্থা এবং বিদ্যালয় পরিচালনার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধানেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষার সুযোগ তৈরি করাই তাঁর কাছে যথেষ্ট ছিল না; সেই সুযোগ যেন সমাজের সাধারণ পরিবারের মেয়েরাও পায়, সেটিও তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছিলেন। তাঁর এই উদ্যোগের পেছনে ছিল একটি গভীর উপলব্ধি একজন শিক্ষিত নারী শুধু নিজের জীবনকেই বদলান না, তিনি একটি পরিবার এবং পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তাভাবনাকেও প্রভাবিত করতে পারেন।
শিক্ষিত মা, সচেতন প্রজন্ম
বিদ্যাসাগরের নারীশিক্ষা ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পরিবার ও সমাজের ভবিষ্যৎ। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শিশুর প্রথম শিক্ষালয় তার পরিবার এবং মায়েরাই শিশুর জীবনের প্রথম শিক্ষক। ফলে নারীরা যদি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে তার প্রভাব পড়বে গোটা সমাজের ওপর। তাই নারীকে শিক্ষিত করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে শিক্ষিত করা নয়,বরং একটি প্রজন্মের ভিত শক্ত করা।
শুধু উদ্যোগ নয়, ছিল সাহসও
বিদ্যাসাগরের সময় নারীশিক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। বিরোধিতা, সমালোচনা এবং সামাজিক চাপ,সবকিছুর মধ্যেই তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু তাঁর সংস্কারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি বিতর্কে থেমে থাকেননি। নিজের বিশ্বাসকে বাস্তব কাজে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
এই কারণেই নারীশিক্ষার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বুঝেছিলেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য শুধু আইন বা আদর্শ যথেষ্ট নয়; দরকার শিক্ষার আলো এবং সেই আলো পৌঁছে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। আজকের দিনে মেয়েদের বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা আমাদের কাছে স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছে বহু মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর কাজ তাই কেবল অতীতের একটি অধ্যায় নয়। আজও তাঁর চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে সমাজ তার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার অধিকার থেকে দূরে রাখে, সেই সমাজ কখনও পূর্ণ বিকাশে পৌঁছতে পারে না।
বিদ্যাসাগর তাই শুধু ‘বিদ্যার সাগর’ ছিলেন না, শিক্ষার আলোকে সমাজের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখা এক সাহসী সমাজসংস্কারকও ছিলেন। তাঁর সেই স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলির একটি, বাংলার মেয়েদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
