নিউজ ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI)-এর দ্রুত প্রসার যেন বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে নতুন করে বৈষম্য তৈরি না করে, এবার সেই বার্তাই দিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে Global South-এর বিভিন্ন দেশ ও সহযোগী রাষ্ট্রগুলির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করতে গিয়ে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি।
জয়শঙ্কর বলেন, AI-সহ দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি বিশ্বের অর্থনীতি ও সমাজে বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সুফল যদি কেবল কিছু দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে বিদ্যমান বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে Global South-এর দেশগুলিরও অর্থবহ ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে উন্নয়নশীল দেশগুলির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উপর বাড়তে থাকা চাপ সবকিছুর মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে আরও সমন্বয়ের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
AI প্রসঙ্গে জয়শঙ্করের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে উন্নত AI মডেল ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, তথ্যের ব্যবহার, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিতে সমান সুযোগের মতো নানা প্রশ্ন উঠছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু প্রযুক্তি তৈরি নয়, কীভাবে সেই প্রযুক্তির সুফল বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে পৌঁছবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
এর পাশাপাশি Global South-এর দেশগুলিকে সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় কোনও ধরনের কৌশলগত ‘চোক পয়েন্ট’-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়ার বার্তা দেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জ্বালানির সরবরাহ বা দামকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয় বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।
খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে শস্য ও সার-এর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন জয়শঙ্কর। আন্তর্জাতিক সংঘাত, সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা এবং অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলির খাদ্য নিরাপত্তার উপর না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বাণিজ্য ও শিল্পায়ন নিয়েও নিজের বক্তব্য রাখেন বিদেশমন্ত্রী। উন্নয়নশীল দেশগুলিকে নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়, যেখানে কোনও দেশের শিল্পায়নের পথ অপ্রয়োজনীয়ভাবে সীমিত হয়ে যায়।
বৈঠকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের নিরাপত্তার উপর গুরুত্ব দেন জয়শঙ্কর। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বলেও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
ভারত গত কয়েক বছরে Global South-এর দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। AI, emerging technology, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো বিষয়ও ভারতের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনায় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, জয়শঙ্করের বক্তব্যে AI-কে শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি। বরং প্রযুক্তি, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং উন্নয়ন, এই চারটি ক্ষেত্রের সঙ্গে AI-এর ভবিষ্যৎকে যুক্ত করে দেখানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা, আগামী দিনের প্রযুক্তি ব্যবস্থার নিয়ম নির্ধারণে উন্নয়নশীল দেশগুলির অংশগ্রহণ এবং তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
