নলের মুখে জল আসবে। কিন্তু সেই জল কি বিনা পয়সায়? কেন্দ্রের ‘জল জীবন মিশন-২’-এর নতুন পরিকল্পনায় সেই প্রশ্নই এখন সামনে। বাড়ি বাড়ি পাইপলাইনে পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামোর খরচ কেন্দ্র ও রাজ্য ভাগ করে নিলেও, সেই ব্যবস্থা চালু রাখা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গ্রামবাসীদের কাছ থেকে মাসে ৪০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্র। সরকারি ভাষায় যার নাম ‘অপারেশন অ্যান্ড মেন্টেনেন্স’—সোজা কথায়, জল সরবরাহ ব্যবস্থার ‘রক্ষণাবেক্ষণ খরচ’। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ বাড়ির হিসাব ধরলে বছরে সেই অর্থের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪৭৯ কোটি টাকা। নির্দিষ্ট অঙ্ক ৪৭৮ কোটি ৯৪ লক্ষ ৭১ হাজার ২০০ টাকা।
কেন্দ্রের পরিকল্পনায় প্রত্যেক মানুষের জন্য প্রতিদিন ৫৫ লিটার করে জল সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। জল পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাইপলাইন, জলাধার, পাম্প-সহ মূল পরিকাঠামো তৈরির খরচ বহন করবে কেন্দ্র ও রাজ্য। কিন্তু পরিকাঠামো তৈরি হয়ে যাওয়ার পরে সেটি সচল রাখা, পাইপলাইন মেরামত, পাম্প চালানো এবং অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণের খরচের একটি অংশ দিতে হবে উপভোক্তাদেরই। ফলে ‘জল কর’ শব্দটি সরকারি নথিতে না থাকলেও বাস্তবে মাসিক টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে।
কত টাকা দিতে হবে, সেটিও সব জায়গায় এক হবে না। কেন্দ্রের প্রস্তাবিত সীমা ৪০ থেকে ৮০ টাকা পরিবার-পিছু মাসে। স্থানীয় স্তরে পঞ্চায়েত অথবা ‘ভিলেজ ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন কমিটি’—ভিডব্লুএসসি—এই টাকা নির্ধারণ করবে। সেই কমিটিতে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও রাখার কথা। প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাড়ানোর সুযোগও থাকবে। অর্থাৎ আজ ৪০ টাকা দিয়ে শুরু হলেও আগামী দিনে অঙ্কটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
দেশের কয়েকটি রাজ্যে ইতিমধ্যেই এই ধরনের ব্যবহারিক মডেল চালু হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে পরিবার-পিছু মাসে ৫০ টাকা, হরিয়ানায় ৪০ টাকা এবং কর্নাটকে ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। সেই মডেলেই পশ্চিমবঙ্গেও জল সরবরাহ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তোলার পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র।
এখানেই আপত্তি তৃণমূলের। তাদের বক্তব্য, গ্রামবাংলার দরিদ্র এবং প্রান্তিক পরিবারের কাছ থেকে জল ব্যবহারের জন্য টাকা নেওয়া হলে ‘হর ঘর জল’ প্রকল্পের সামাজিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রী সি আর পাতিলের ডাকা রাজ্যভিত্তিক জনপ্রতিনিধিদের বৈঠকে এই আপত্তি জানান উলুবেড়িয়ার তৃণমূল সাংসদ সাজদা আহমেদ। বৈঠকে রাজ্যের আরও কয়েক জন জনপ্রতিনিধি উপস্থিত থাকলেও এই বিষয়ে তাঁরা কোনও বক্তব্য রাখেননি।
৫ অগস্টের ওই বৈঠকে বাংলার জল জীবন মিশনের অগ্রগতির পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়। রাজ্যের পুর এলাকার বাইরে মোট ১ কোটি ৭৫ লক্ষ ৫০ হাজার ৫৯৮টি বাড়ি রয়েছে। তার মধ্যে ৯৯ লক্ষ ৭৮ হাজার ৬৫টি বাড়িতে এখনও পর্যন্ত নলবাহিত জল পৌঁছেছে। ২০১৯ সাল থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিয়ে প্রকল্পে খরচ হয়েছে ২৮ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা।
তবে টাকা দেওয়ার প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতও স্পষ্ট। সাজদার দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে রাজ্য সরকার প্রকল্পে ৩৯১ কোটি টাকা দিলেও কেন্দ্র কোনও অর্থ দেয়নি। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে কেন্দ্রের দেওয়ার কথা ছিল ৫,০৫০ কোটি টাকা। কিন্তু বরাদ্দ হয়েছিল ২,৫২৫ কোটি। কেন কেন্দ্রের বরাদ্দ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেল, সেই প্রশ্নও বৈঠকে তোলেন তৃণমূল সাংসদ। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছ থেকে তার কোনও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
২০১৯ সালের ১৫ অগস্ট ‘জল জীবন মিশন’ ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি গ্রামীণ বাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া। স্লোগান ছিল—‘হর ঘর জল’। নির্ধারিত সময়সীমায় সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় এ বার ২০২৮ সালের নতুন সময়সীমা নিয়ে ‘জল জীবন মিশন-২’।
কিন্তু নতুন প্রকল্পের সঙ্গে নতুন প্রশ্নও। যে জলকে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ‘হর ঘর জল’-এর স্লোগান, সেই জল পৌঁছনোর পরে তার জন্য মাসে টাকা দিতে হলে গ্রামবাংলার গরিব পরিবারের উপর নতুন আর্থিক বোঝা চাপবে কি না, সেই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। কেন্দ্র বলছে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ, বিরোধীদের চোখে তা কার্যত ‘জল কর’। আর বাংলার ক্ষেত্রে সেই খরচের বার্ষিক অঙ্ক প্রায় ৪৭৯ কোটি টাকা।