পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার আগেই কি উত্তর পৌঁছে গিয়েছিল পরীক্ষার্থীদের কাছে? ঝাড়খণ্ডের JSSC নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস-কাণ্ডে CID-এর তদন্ত রিপোর্ট ঘিরে সামনে আসা তথ্য সেই প্রশ্নই আরও জোরালো করছে। তদন্তে উঠে এসেছে, ১৫০টি প্রশ্নের মধ্যে ১৩৫টির উত্তর পরীক্ষার আগেই ফাঁস হয়েছিল বলে অভিযোগ। তার মধ্যে ১২০টি উত্তর মিলে যায় আসল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে।
শুধু তাই নয়, ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তর WhatsApp-এর মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। টাকা দিয়ে প্রশ্ন সংগ্রহ করা কয়েক জন পরীক্ষার্থীকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ। ফলে এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ‘পেপার লিক’ ছিল, নাকি তার পিছনে সক্রিয় ছিল একটি সংগঠিত চক্র—এখন সেই প্রশ্নই তদন্তের কেন্দ্রে।
১৫০ প্রশ্নের মধ্যে ১৩৫টির উত্তর আগে থেকেই?
CID তদন্তের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রশ্নের সংখ্যাকে ঘিরে। তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার আগে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে ১৩৫টি উত্তরের মিল পাওয়া যায়। তার মধ্যে ১২০টি উত্তর আসল প্রশ্নপত্রের প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায় বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি সত্যি প্রমাণিত হলে প্রশ্নফাঁসের মাত্রা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে। কারণ, এখানে একটি বা দু’টি প্রশ্ন বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ নয়। প্রশ্নপত্রের বড় একটি অংশ এবং তার সম্ভাব্য উত্তর পরীক্ষার আগে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে। তদন্তকারীদের কাছে তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রশ্নফাঁসের পুরো চেনটি—প্রশ্নপত্র কোথা থেকে বেরোল, কে উত্তর তৈরি করল, কারা তা ছড়াল এবং কারা টাকা দিয়ে তা কিনল।
WhatsApp-এ প্রশ্ন, সঙ্গে উত্তরও
এই ঘটনায় ডিজিটাল যোগাযোগের ব্যবহার তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগ, WhatsApp-এর মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তর বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পাঠানো হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রশ্নপত্র একবার বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পর তা দ্রুত একাধিক ব্যক্তির হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রথম WhatsApp মেসেজটি কে পাঠিয়েছিল? প্রশ্নপত্রের ছবি বা কপি প্রথম কার কাছে পৌঁছেছিল? সেই নম্বরগুলির সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিল? এবং টাকা লেনদেনের সঙ্গে সেই যোগাযোগের কোনও যোগ ছিল কি না?
টাকা দিয়ে প্রশ্ন, তার পর উত্তর ‘শেখানোর’ অভিযোগ
তদন্তে আরও যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা আরও গুরুতর। টাকা দিয়ে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করা কয়েক জন পরীক্ষার্থীকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। অর্থাৎ, প্রশ্নফাঁসের উদ্দেশ্য শুধু প্রশ্নপত্র বিক্রি করা ছিল না—পরীক্ষার্থীদের সম্ভাব্য উত্তরও আগে থেকে জানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল কি না, সেটিও এখন তদন্তের বিষয়। এই জায়গাতেই অর্থের লেনদেনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কত টাকা নেওয়া হয়েছিল? কারা টাকা দিয়েছিলেন? কারা টাকা নিয়েছিলেন? মাঝখানে কত জন দালাল বা মধ্যস্থতাকারী ছিল? প্রশ্নপত্রের উৎস পর্যন্ত সেই টাকা পৌঁছেছিল কি না?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর মিললেই চক্রের আসল কাঠামো সামনে আসতে পারে।
হাজারিবাগ থেকে পটনা, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে নেপাল?
প্রশ্নফাঁসের নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়েও তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। হাজারিবাগ, জামশেদপুর, পটনা, পশ্চিমবঙ্গ এবং নেপাল—এই সব জায়গার সঙ্গে যোগসূত্রের কথা তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্যে উঠে এসেছে। এর ফলে তদন্তের পরিধি শুধু একটি পরীক্ষাকেন্দ্র বা একটি জেলার মধ্যে আটকে নেই। প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা একাধিক জায়গায় সক্রিয় ছিলেন কি না, অন্য পরীক্ষাতেও একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না—সেটিও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
আন্দোলনে চাকরিপ্রার্থীরা
প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে ঝাড়খণ্ডে চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভও নতুন করে তীব্র হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, একটি নিয়োগ পরীক্ষা শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা নয়—হাজার হাজার তরুণের ভবিষ্যৎ তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তাঁদের অভিযোগ, বার বার নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নফাঁস বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে মেধার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়ার সুযোগটাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আন্দোলনকারীদের একাংশ CID তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। রাজ্যের বাইরে থেকে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিটি তৈরির দাবিও উঠেছে। পাশাপাশি CBI তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের একাংশ।
আসল প্রশ্ন—‘ছোট মাছ’ নয়, মাথা কোথায়?
এই কাণ্ডে কয়েক জন পরীক্ষার্থী, দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে।
কারণ, পরীক্ষার আগে যদি সত্যিই প্রশ্নের এত বড় অংশ এবং উত্তর নির্দিষ্ট মহলের হাতে পৌঁছে থাকে, তা হলে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একাধিক স্তর ভাঙার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তদন্ত তাই শুধু প্রশ্ন কিনেছিলেন এমন ব্যক্তিদের ঘিরে থাকলে চলবে না। প্রশ্নপত্রের উৎস, মুদ্রণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, পরিবহণ, পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছনোর আগে তার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার গোটা পথ খতিয়ে দেখা জরুরি।
১২০টি উত্তর মিলে গেলে প্রশ্নটা শুধু JSSC-র নয়
CID রিপোর্টে উঠে আসা ১৩৫টি উত্তর ফাঁস এবং ১২০টি উত্তর আসল প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যাওয়ার দাবি শেষ পর্যন্ত তদন্তে কতটা প্রমাণিত হয়, সেটাই এখন দেখার। তবে এই অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তা হলে ঘটনাটি শুধুমাত্র JSSC পরীক্ষার অনিয়ম হিসেবে দেখার সুযোগ থাকবে না। ঝাড়খণ্ডের নিয়োগ পরীক্ষার নিরাপত্তা, প্রশ্নপত্র তৈরির গোপনীয়তা এবং গোটা নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই বড় প্রশ্ন উঠবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটাই-
পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র পৌঁছনোর আগেই যদি তার উত্তর কারও হাতে পৌঁছে যায়, তবে সেই উত্তর পৌঁছে দেওয়ার দরজা খুলেছিল কে?
সেই ‘দরজা’র চাবি কার হাতে ছিল, আর তার পিছনে থাকা মাথা পর্যন্ত তদন্ত পৌঁছতে পারে কি না—এখন নজর সেদিকেই।