--"শোনো, আমাদের লক্ষ্য ওই অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট। কাল ভোরের সূর্য ও যেন না দেখে! কী, পারবে তো?"
--'পারব না! আমার ওপর দায়িত্ব আমার মায়ের ওপর যে অত্যাচার করছে, তাকে শাস্তি দেওয়ার। ওই ম্যাজিস্ট্রেট-কে সরিয়ে আমি দেবই! আমার গর্ভধারিনী মায়ের দিব্যি-- আমি দেশ-মা'কে স্বাধীন করবই করব।'
--"বেঁচে ফিরতে পারবেনা! হয়তো...."
'কী এসে যায়! মুক্তির জন্য; স্বাধীনতার জন্য-- বিপ্লবের জন্য, বলি আগেও হয়েছে, পরেও হবে। আমিই বা বাদ থাকব কেন?'
--"এই তো চাই! বন্দেমাতরম!"
'বন্দেমাতরম।'
অন্ধকারে ঘন জঙ্গলের ভেতর; কালো অন্ধকারে, মিশে গেল একটি বছর আঠারোর তরুণ। বনের ওপাশে অপেক্ষা করছে আরেকটি তরুন। তাদের ওপর বিরাট দায়িত্ব--এক প্রবল অত্যাচারী ইংরেজ রাজপুরষ। তার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল আরেক বিপ্লবীর বুক থেকে!
"এ তুমি কাকে এনেছ হেম? এতো একেবারেই নাবালক।'' কিশোর ছেলেটিকে দেখে প্রশ্ন করলেন তিনি।
'বয়সে। কাজে নয়।' চোয়াল শক্ত হল হেমচন্দ্র কানুনগোর।
"বুঝলাম। কিন্ত, ও জানে তো; ওকে ঠিক কী করতে হবে?
জানে বারীনদা। আর, এই কাজটাই ও সবথেকে ভাল করে। ইস্কুলে একটাও আম-পেয়ারা ওর নিশানা থেকে বাঁচেনা!'আর..
''আর?''
'ওর মতো এক সাহসী ছেলের শিক্ষক হতে পেরেছি বলে আমার গর্ব হয়। গ্রামের হাটে স্বদেশী পত্রপত্রিকা বিলিয়ে বেড়ায়। ইংরেজ পুলিশের ভয় করেনা।'
তোমার নাম?
'ক্ষুদিরাম বসু।' ছেলেটির গলায় আগুন ঝলকায় যেন!
বুঝলেন বারীন ঘোষ। এই ছেলেটিই পারবে অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ডকে চরম শিক্ষা দিতে।
পেরেছিল ক্ষুদিরাম। কিংসফোর্ড মারা যাননি ঠিকই, তবে একটা ঘুণে ধরা সমাজের বুকে ঠিক জায়গামতো বোমার আঘাতে জ্বালিয়ছিল বিপ্লবের আগুন! সঙ্গী প্রফুল্ল চাকীকে সঙ্গে নিয়ে আঘাত করতে চেয়েছিল ব্রিটিশ সরকারের বুকে! সে আঘাতে ভীত ইংরেজ প্রশাসন তাঁকে ফাঁসি দিয়ে শেষ করতে চাইলেও, তিনি থেকে গেলেন মানুষের মনে।
"ওঠো,সোনম! এখনও অনেককে শিক্ষা দিতে হবে। অনেক ক্ষুদিরাম বসুকে তৈরি করতে হবে।" হেমচন্দ্র কানুনগোর গলা পেলেন সোনম ওয়াংচুক। ছাত্র আন্দোলনের আজ তেইশ'তম দিন! তিনি মনস্থির করলেন।
"তুমি অনশন করে শেষ হয়ে গেলে, এই তরুণ মুখগুলোর কী হবে? আমাদের লড়াই তো শুধু ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ছিল না। এই লড়াই ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে। তাতো শেষ হয়নি।" মাথাটা তুললেন সোনম ওয়াংচুক। স্ত্রী পাশেই বসে আছেন। তিনি দেখতে পাচ্ছেননা বারীন ঘোষ-কে। সোনম পাচ্ছেন। তার মনে ফের ধিকধিকি আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে লাগল। তাকে জেতাতেই হবে--তরুণ প্রজন্মকে।
মাথায় একটা কার হাতের ছোঁয়া পেলেন অনশনরত দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখতে পেলেন-ক্ষুদিরাম বসু। 'বন্দেমাতরম' মন্ত্রোচ্চারন করলেন তিনি। দেবেন্দ্রনাথ মাহাতোও বললেন 'বন্দেমাতরম'। আগামীকাল ঝাড়খণ্ড বিধানসভা ঘেরাও। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেবেননা দেবেন্দ্রনাথ মাহাতো। সেই উদ্দেশ্যেই যেন আরো শক্ত বাঁধন দিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেন বছর আঠারোর নির্ভয় এক বিপ্লবী--ক্ষুদিরাম বসু!
ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গের কোন এক ঘরে এক ক্লাস টুয়েলভের ছেলে তখন একমনে পড়ছে আরেক আঠারোর বছর বয়েস কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা কবিতা-
'এ বয়স জেনাে ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই নেই কোন সংশয়—
এ দেশের বুকে আঠারাে আসুক নেমে'