গোয়া: কথাটা হয়তো নিছকই জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে বলা। হয়তো মুহূর্তের ভাবনা। হয়তো দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে জীবনের কথা বলছিলেন তিনি। কিন্তু চার দিন পর সেই কথাই যেন হঠাৎ অন্য অর্থ পেল।
‘‘আজ আছি, কাল থাকব কি না জানি না।’’
চার দিন আগে গোয়ার একটি অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমনই কথা বলেছিলেন নানা পাটেকর। তখন কে জানত, সেই ‘কাল’-এর অপেক্ষাতেই তাঁকে আর পাওয়া যাবে না! সাদা পোশাকে, স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলা সেই মানুষটিকে শেষ বার দেখেছিল দর্শক। তার পরেই আচমকা নিভে গেল আলো।
৭৫ বছর বয়সে প্রয়াত নানা পাটেকর
বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার ডোনা পাউলার বাড়িতে অচৈতন্য অবস্থায় পাওয়া যায় অভিনেতাকে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সাড়া দেননি তিনি। ভোর ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ তাঁর মৃত্যু ঘোষণা করা হয়।
একটা রাত। তার পর একটা ভোর। আর সেই ভোরেই শেষ হয়ে গেল ভারতীয় সিনেমার এক দীর্ঘ অধ্যায়।
নানা পাটেকরের শেষ প্রকাশ্য উপস্থিতিও এখন তাই আরও বেশি করে মনে পড়ছে। মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে, ৪ অক্টোবর, গোয়ার ডোনা পাউলায় একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। মঞ্চে উঠে কথা বলেছিলেন। দর্শকদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। তখনও কেউ ভাবেননি, সেটিই হবে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখার শেষ মুহূর্ত।
সিনেমার পর্দায় নানা পাটেকর কখনও কোমল ছিলেন না। তাঁর অভিনয়ে ছিল একটা কাঁটা—যে কাঁটা দর্শকের মনে বিঁধে থাকত। চোখের দৃষ্টি, সংলাপ বলার ভঙ্গি, হঠাৎ গলার স্বর বদলে ফেলা—সব কিছুতেই ছিল এক ধরনের অস্থির শক্তি। তিনি চরিত্রকে শুধু অভিনয় করতেন না, যেন চরিত্রের ভিতরে ঢুকে যেতেন।
‘পরিন্দা’-র অন্ধকার জগৎ থেকে ‘ক্রান্তিবীর’-এর আগুনঝরা প্রতিবাদ, ‘অগ্নিসাক্ষী’-র তীব্রতা থেকে ‘আব তক ছাপ্পন’-এর কঠিন পুলিশ অফিসার—বার বার নিজেকে ভেঙেছেন, আবার নতুন করে তৈরি করেছেন। আর ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি? সেখানে সেই একই নানার হয়ে উঠেছিলেন হাসির এক অনবদ্য চরিত্র। দর্শক তাঁকে দেখে হেসেছে, অথচ সেই হাসির মধ্যেও অভিনেতার নিজস্ব ধার কখনও হারায়নি।
এই দ্বৈততাই ছিল নানা পাটেকরের সবচেয়ে বড় শক্তি। এক দিকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সমাজ, মানুষ, জীবন নিয়ে কথা বলা এক সংবেদনশীল মানুষ। অন্য দিকে পর্দায় এমন চরিত্র, যাঁর চোখের এক ঝলকেই দৃশ্যের সমস্ত ভার বদলে যেত।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ দিয়ে চলচ্চিত্রজগতে পা। তার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়। জাতীয় পুরস্কার এসেছে একাধিক বার। পেয়েছেন পদ্মশ্রীও। কিন্তু পুরস্কারের তালিকা দিয়ে নানা পাটেকরের পরিচয় শেষ করা যায় না। কারণ তাঁর আসল পরিচয় ছিল দর্শকের স্মৃতিতে।
তাঁর বলা সংলাপ মনে থাকে। তাঁর রাগ মনে থাকে। তাঁর নীরবতাও মনে থাকে। অভিনয়ের বাইরেও মানুষের পাশে থাকার জন্য আলাদা পরিচিতি ছিল তাঁর। কৃষক, গ্রামীণ মানুষ এবং সমাজের প্রান্তিক অংশের জন্য কাজ করেছেন। অর্থাৎ পর্দায় যে মানুষটিকে এত কঠিন মনে হত, পর্দার বাইরে তাঁর অন্য এক মুখও দেখেছেন মানুষ।
আর সেই মানুষটিই চার দিন আগে মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের অজান্তেই যেন বলে গিয়েছিলেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যিটা—মানুষ আসলে জানে না, তার হাতে আর কতটা সময় রয়েছে।
সেই সময়টাই আর পেলেন না নানা। গোয়ার বাড়ি, ভোরের নিস্তব্ধতা, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ—তার পর একটি ঘোষণা। থেমে গেল কণ্ঠস্বর।
যে কণ্ঠ এক সময় পর্দা কাঁপিয়েছে, যে চোখে রাগ দেখলে দর্শক চুপ করে গিয়েছে, যে অভিনয়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সিনেমা সমৃদ্ধ হয়েছে—সেই নানা পাটেকর আর নেই।
চার দিন আগে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলা কথাটা তাই আজ যেন বিদায়ের মতো শোনাচ্ছে। ‘আজ আছি, কাল থাকব কি না জানি না।’
সত্যিই, সেই কালটা আর এল না। নানা চলে গেলেন। রয়ে গেলেন তাঁর চরিত্রেরা। আর রয়ে গেল সেই কণ্ঠ—যে কণ্ঠ ভারতীয় সিনেমার পর্দা থেকে হয়তো আর কোনও দিন শোনা যাবে না, কিন্তু দর্শকের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না।
