বিশেষ প্রতিবেদন: একটি ড্রোন উড়ছিল আকাশে। উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ের ছবি তোলা। কিন্তু ক্যামেরায় আচমকাই ধরা পড়ল এমন এক দৃশ্য, যার কয়েক ঘণ্টা পরেই নেপাল-তিব্বত সীমান্তে নেমে এল ভয়াবহ বিপর্যয়। পাহাড়ের বুক চিরে হঠাৎ নীচে নেমে এল বরফ, পাথর আর ধুলোর বিশাল স্তূপ। মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল গোটা পাহাড়ের চেহারা। সেই ভিডিয়োই এখন সামনে এসেছে। আর তা থেকেই আরও স্পষ্ট হচ্ছে, গত সপ্তাহের ভয়াবহ হড়পা বান কী ভাবে শুরু হয়েছিল।
ঘটনাস্থল লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছাকাছি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭২০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় হিমালয়ের ওই দুর্গম এলাকায় হঠাৎই হিমবাহের নীচের পাথুরে অংশের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। তার সঙ্গে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর। চিনা এক আলোকচিত্রীর ড্রোনে ঘটনাটি কার্যত ‘লাইভ’ ধরা পড়ে যায়। ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, প্রথমে পাহাড়ের ঢালে সামান্য নড়াচড়া। তার পরেই যেন মুহূর্তে পাহাড়ের একটা অংশ খুলে পড়ল। নীচে আছড়ে পড়তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ধুলোর কালো মেঘ।
সেই ধসই কি কয়েকশো মানুষের মৃত্যুর শুরু?
বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ বলছে, হিমবাহ ভেঙে পড়ার পর বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নীচের নদীখাতে আছড়ে পড়ে। তৈরি হয় প্রবল গতির ধ্বংসস্রোত। লহেন্দে খোলার পথে সেই স্রোত নীচে নামতে নামতে আরও পাথর, মাটি ও বরফ টেনে নেয়। শেষ পর্যন্ত তা ভয়াবহ হড়পা বানের রূপ নেয়।
শুধু বন্যা নয়, এই ঘটনায় তৈরি হয়েছিল বিশাল ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত। রাস্তাঘাট, সেতু, বাড়িঘর, বিদ্যুৎ প্রকল্প—সব কিছুই তার পথে পড়ে যায়। বহু জায়গায় নদীর গতিপথ পর্যন্ত বদলে গিয়েছে। নেপালের রাসুয়া জেলা থেকে তিব্বতের গিরং বন্দর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় বিপর্যয়ের চিহ্ন স্পষ্ট।
ঘটনার ভয়াবহতা বোঝা যায় আর একটি তথ্যেও। হিমবাহ-পাথরের সেই বিশাল পতন এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তার অভিঘাত ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাতেও ধরা পড়ে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে ঘটনাটিকে প্রায় ৫.২ মাত্রার ভূকম্পন-সদৃশ সিসমিক সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে বিজ্ঞানীরা জানান, সেটি আসলে বিশাল ভূমিধসের অভিঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আর এখানেই ড্রোনের ভিডিয়োটির গুরুত্ব। এত দিন উপগ্রহচিত্র এবং ধসের পরের ছবি দেখে বিজ্ঞানীরা বিপর্যয়ের উৎস খুঁজছিলেন। এ বার পাহাড় ভেঙে পড়ার সরাসরি দৃশ্য সামনে আসায় সেই ঘটনাক্রম আরও পরিষ্কার হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথমে হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধস, তার পরে নদীতে ধ্বংসাবশেষের আঘাত, এবং শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ হড়পা বান—ক্রমটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।
তবে হিমবাহ কেন ওই ভাবে ভেঙে পড়ল, তা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহের বরফ ও উচ্চ পার্বত্য এলাকার পাথুরে ঢাল দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে এই নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করার মতো চূড়ান্ত প্রমাণ এখনও নেই।
এ দিকে বিপর্যয়ের পর নেপাল ও তিব্বতে উদ্ধারকাজ চলছে। মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৯০০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ কয়েক হাজার। বহু গ্রাম কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষদের খোঁজে চলছে উদ্ধার অভিযান।
পাহাড়ের গায়ে কয়েক সেকেন্ডের সেই কম্পন, বরফের পতন আর ধুলোর মেঘ—ড্রোনের ক্যামেরায় ধরা পড়া দৃশ্য এখন শুধু একটি ভিডিয়ো নয়। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের প্রথম মুহূর্তের এক ভয়াবহ দলিল। যে মুহূর্তে পাহাড় ভেঙেছিল, তার অভিঘাত এখনও কাটেনি।