আয়নায় তাকিয়ে হঠাৎই চোখে পড়ল মাথার এক পাশে চুল পাতলা। ভ্রুর এক কোণে ফাঁকা জায়গা। চোখের পাপড়িও যেন আগের মতো ঘন নেই। প্রথমে মনে হতে পারে, অতিরিক্ত চুল পড়ছে। কেউ ভাবেন পুষ্টির অভাব, কেউ আবার দোষ দেন শ্যাম্পু বা দূষণকে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সব ক্ষেত্রে কারণ এতটা সহজ নয়। অনেক সময় এর নেপথ্যে থাকে এমন এক মানসিক অসুখ, যা নিয়ে এখনও খোলাখুলি কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন অধিকাংশ মানুষ— ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া (Trichotillomania)।
বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই সমস্যায় ভুগলেও, অনেকেই জানেন না যে এটি একটি স্বীকৃত মানসিক রোগ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি Hair-Pulling Disorder নামে পরিচিত এবং Obsessive-Compulsive and Related Disorders (OCRD)-এর অন্তর্গত। অর্থাৎ এটি কোনও 'বদভ্যাস' নয়, কিংবা ইচ্ছাশক্তির অভাবও নয়। এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে বারবার নিজের চুল বা শরীরের লোম টেনে তোলার প্রবল তাগিদ তৈরি হয়। সেই তাগিদকে আটকাতে চান রোগী, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পারেন না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, অনেকেই বুঝতেই পারেন না কখন এই অভ্যাস তাঁদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। অফিসে কাজ করতে করতে, অনলাইনে মিটিং চলাকালীন, বই পড়তে পড়তে, পড়াশোনার ফাঁকে কিংবা গভীর রাতে একা বসে— অজান্তেই হাত চলে যায় মাথার দিকে। একটি চুল, তারপর আরেকটি। কখনও ভ্রুর লোম, কখনও চোখের পাপড়ি। চুল টেনে ফেলার পর কয়েক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত এক স্বস্তি আসে। কিন্তু সেই স্বস্তির জায়গা খুব দ্রুতই দখল করে নেয় অপরাধবোধ, লজ্জা এবং অনুশোচনা।
মনোবিদদের মতে, ট্রাইকোটিলোম্যানিয়ার নির্দিষ্ট একটি কারণ নেই। বরং একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে সূক্ষ্ম পরিবর্তনও এই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। উদ্বেগ, মানসিক চাপ, একাকিত্ব, বিষণ্নতা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতাও এই রোগের বড় ট্রিগার। অনেকের কাছে চুল টানা যেন অজান্তেই মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তির উপায় হয়ে ওঠে।
সমস্যা এখানেই শেষ নয়। দিনের পর দিন একই জায়গা থেকে চুল টানতে থাকলে মাথায় টাকের মতো অংশ তৈরি হয়। ভ্রু বা চোখের পাপড়ি পাতলা হয়ে যায়। অনেকেই তখন টুপি, স্কার্ফ, উইগ বা মেকআপ দিয়ে সেই দাগ ঢাকার চেষ্টা করেন। সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে অস্বস্তি হয়, আত্মবিশ্বাস কমতে থাকে। কেউ কেউ আয়নার সামনে দাঁড়াতেও ভয় পান। স্কুল-কলেজের পড়াশোনা, অফিসের কাজ, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে।
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ ধরা পড়ার জন্য কোনও বিশেষ রক্ত পরীক্ষা বা স্ক্যানের প্রয়োজন হয় না। রোগীর আচরণ, উপসর্গ এবং মানসিক অবস্থার মূল্যায়নের ভিত্তিতেই রোগ নির্ণয় করা হয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)-কে। বিশেষ করে হ্যাবিট রিভার্সাল ট্রেনিং (HRT) রোগীকে শেখায় কীভাবে চুল টানার তাগিদ চিহ্নিত করে তার বদলে অন্য একটি নিরাপদ অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। যেমন স্ট্রেস বল ব্যবহার, ফিজেট টয় নিয়ে খেলা, আঁকাআঁকি, বুনন বা হাত ব্যস্ত রাখার অন্য কোনও কাজ।
জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তনও এই রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, মেডিটেশন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম এবং মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা উপসর্গ অনেকটাই কমাতে সাহায্য করে। প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মতো সহ-বিদ্যমান সমস্যার ভিত্তিতে ওষুধও দিতে পারেন। তবে ওষুধ কখনওই নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা রোগ নয়, রোগ নিয়ে নীরবতা। লজ্জা বা সংকোচের কারণে বহু মানুষ চিকিৎসকের কাছে যান না। অথচ ট্রাইকোটিলোম্যানিয়া সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। সময়মতো সঠিক থেরাপি শুরু হলে অধিকাংশ রোগীই ধীরে ধীরে এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সক্ষম হন।
তাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যদি বারবার মনে হয়, নিজের অজান্তেই চুল কমে যাচ্ছে, কিংবা চুল টানার প্রবণতা আর নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না, তাহলে সেটিকে শুধুই 'খারাপ অভ্যাস' ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। অনেক সময় এটি মনের নীরব আর্তনাদ— যার চিকিৎসা আছে, প্রয়োজন শুধু সময়মতো সাহায্য চাওয়ার।