"কোই হামদম না রহা...", "রূপ তেরা মস্তানা", "পল পল দিল কে পাস", "জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা", "চিঙ্গারি কোই ভড়কে"...— ভারতীয় উপমহাদেশে এমন কোনও সঙ্গীতপ্রেমী খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি এই গানগুলি শোনেননি। কিন্তু এই গানগুলির মধ্যে শুধু একটি সুর বা কণ্ঠ নেই; রয়েছে এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্বের ছাপ। তিনি কিশোর কুমার। জন্মের নাম অভাষ কুমার গাঙ্গুলী। জন্ম ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট, মধ্যপ্রদেশের খাণ্ডওয়ায়। মৃত্যুর প্রায় চার দশক পরেও ভারতীয় সঙ্গীতজগতে তাঁর বিকল্প তৈরি হয়নি। তাই প্রতি বছর ৪ আগস্ট শুধু একজন শিল্পীর জন্মদিন নয়, ভারতীয় সঙ্গীতের এক অনন্য যুগেরও উদ্যাপন।
যে ছেলেটি গায়ক হতে চাননি
১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট তৎকালীন সেন্ট্রাল প্রভিন্সের (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) খাণ্ডওয়ায় এক বাঙালি পরিবারে জন্ম অভাষ কুমার গাঙ্গুলীর। বাবা কুঞ্জলাল গাঙ্গুলী ছিলেন আইনজীবী। মা গৌরীদেবী ছিলেন সঙ্গীতপ্রেমী। বড় ভাই ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা অশোক কুমার। পরে আর এক ভাই অনূপ কুমার এবং বোন সতীদেবীও চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত হন। মজার বিষয়, ছোটবেলায় কিশোরের গলায় খুব সুর ছিল না বলেই পরিবারের অনেকে মনে করতেন। কিন্তু তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কে. এল. সায়গল-এর গান নকল করতেন। সেই অনুকরণই একদিন তাঁকে নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
অভাষ থেকে কিশোর
চলচ্চিত্রে প্রথমে গায়ক হিসেবে নয়, অভিনেতা হিসেবেই তাঁর প্রবেশ। বড় ভাই অশোক কুমারের হাত ধরেই মুম্বইয়ে আসা। স্টুডিয়োর পরিবেশ, সিনেমার সেট, রেকর্ডিং— সবকিছুই ধীরে ধীরে তাঁকে টেনে আনে। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সময়ই তাঁর নাম বদলে হয় কিশোর কুমার। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
সংগ্রামের গল্প
আজকের কিংবদন্তিকে দেখে বোঝার উপায় নেই, শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন তিনি ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছেন। গানের সুযোগও মিলেছে খুব কম। অনেক সঙ্গীত পরিচালকই মনে করতেন, তাঁর কণ্ঠ খুব অদ্ভুত, প্রচলিত নিয়মের বাইরে। তবে তিনি নিজের স্বকীয়তা বদলাননি। বরং সেই ভিন্নতাকেই শক্তি বানিয়েছিলেন।
একটি গান, যা বদলে দিল ইতিহাস
১৯৬৯ সাল। শক্তি সামন্ত পরিচালিত 'আরাধনা'। রাজেশ খান্নার ঠোঁটে "মেরে সপ্নোঁ কি রানি" আর "রূপ তেরা মস্তানা"— এই দুটি গান শুধু সুপারহিট হয়নি, বদলে দিয়েছিল হিন্দি চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গানের ইতিহাস।
এই ছবির পর থেকে রাজেশ খান্নার কণ্ঠ বলতে দর্শক বুঝতে শুরু করেন কিশোর কুমারকে। পরে একই সম্পর্ক তৈরি হয় অমিতাভ বচ্চন, দেব আনন্দ, ধর্মেন্দ্র, ঋষি কপূর, মিঠুন চক্রবর্তী-সহ একাধিক অভিনেতার সঙ্গে।
এক কণ্ঠে হাজার রং
কিশোর কুমারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বহুমাত্রিকতা। প্রেমের গান যেমন গাইতে পারতেন, "পল পল দিল কে পাস...", তেমনই বিষাদের গানেও তিনি ছিলেন অনন্য—"দুখী মন মেরে..."! আবার দুষ্টুমি ভরা গান—"এক চতুর নার...", বা দার্শনিক ভাবনার গান— "জিন্দেগি কা সফর..."! প্রতিটি গানে যেন আলাদা একজন কিশোর কুমার।
সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁর কণ্ঠে ছিল এক বিরল আবেগের ক্ষমতা। তিনি শুধু গান গাইতেন না, অভিনয় করতেন কণ্ঠ দিয়ে। শুধু গায়ক নন, অনেকেই জানেন না, কিশোর কুমার ছিলেন—অভিনেতা, সুরকার, গীতিকার, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার৷ তাঁর 'দূর গগন কি ছাঁও মে', 'দূর কা রাহি'-র মতো ছবিতে তাঁর পরিচালনার ছাপ আজও আলোচিত।
বাংলার সঙ্গে তাঁর অদৃশ্য নাড়ির টান
যদিও কর্মজীবনের বড় অংশ কেটেছে মুম্বইয়ে, শিকড় ছিল বাঙালি পরিবারে। বাংলা গানেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। "এই যে নদী যায় সাগরে...", "একদিন পাখি উড়ে...", "আমার পূজার ফুল...", "নীল আকাশের নীচে..." আজও বাংলা গানের প্লেলিস্টে সমান জনপ্রিয়।
বাংলার শ্রোতারা তাঁকে কখনও শুধুমাত্র বলিউডের শিল্পী হিসেবে দেখেননি; তিনি ছিলেন নিজের বাড়ির মানুষ।
পুরস্কারের চেয়ে বড় ছিল মানুষের ভালোবাসা
কিশোর কুমার আটবার ফিল্মফেয়ার সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়কের পুরস্কার পান। দীর্ঘদিন এই রেকর্ড অটুট ছিল। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল শ্রোতাদের ভালোবাসা। রেডিওর যুগ থেকে ক্যাসেট, সিডি, এমপি-থ্রি, ইউটিউব, ওটিটি— প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু কিশোরের গান শোনার অভ্যাস বদলায়নি।
জরুরি অবস্থার প্রতিবাদ
১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময় সরকারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইতে অস্বীকার করেছিলেন কিশোর কুমার। এর পর তাঁর গান অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শনে সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় তৎকালীন সরকার। আয়কর দফতরের অভিযানের মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। তবু তিনি নিজের সিদ্ধান্ত বদলাননি। শিল্পীর স্বাধীনতা নিয়ে তাঁর এই অবস্থান আজও আলোচিত।
ব্যক্তিগত জীবনও ছিল আলোচনায়
চারবার বিয়ে করেছিলেন কিশোর কুমার। প্রথম স্ত্রী রুমা গুহঠাকুরতা, পরে মধুবালা, যোগিতা বালি এবং লীনা চন্দ্রাভারকর। বিশেষ করে মধুবালার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। অসুস্থ মধুবালার শেষ জীবনে তাঁর পাশে থাকার গল্প আজও আবেগ ছুঁয়ে যায়।
শেষ ইচ্ছা— ফিরতে চেয়েছিলেন খাণ্ডওয়ায়
জীবনের শেষ দিকে বারবার বলতেন, সব ছেড়ে নিজের জন্মভূমি খাণ্ডওয়ায় ফিরে যাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৫৮ বছর বয়সে প্রয়াত হন তিনি। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী শেষকৃত্য হয় খাণ্ডওয়াতেই।
কেন আজও অমর?
প্রজন্ম বদলেছে। এখন গান শোনার মাধ্যম স্মার্টফোন, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, অ্যালগরিদম। তবু নতুন প্রজন্মের প্লেলিস্টেও সমান জায়গা দখল করে আছেন কিশোর কুমার। কারণ, তাঁর গান কোনও নির্দিষ্ট সময়ের নয়। প্রেমে পড়লে যেমন তাঁর গান মনে পড়ে, তেমনই একাকীত্বে, ভ্রমণে, সাফল্যে, ব্যর্থতায় কিংবা জীবনের গভীর দর্শন খুঁজতেও তাঁর কণ্ঠই ভরসা হয়ে ওঠে। হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি, অসমিয়া, কন্নড়, ভোজপুরি-সহ একাধিক ভাষায় তিনি গান গেয়েছেন। কয়েক হাজার গানের বিশাল ভাণ্ডার আজও ভারতীয় সঙ্গীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
জাদুকরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন
কিশোর কুমারকে শুধু একজন প্লেব্যাক গায়ক বললে তাঁর পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, অভিনেতা, সুরকার, নির্মাতা, কৌতুকশিল্পী, দার্শনিক এবং সর্বোপরি এক স্বাধীনচেতা শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে যেমন প্রেম ছিল, তেমনই ছিল বেদনা; যেমন উচ্ছ্বাস ছিল, তেমনই ছিল নিঃসঙ্গতার দীর্ঘশ্বাস।
৪ আগস্ট তাই শুধু একটি জন্মদিন নয়। ভারতীয় সঙ্গীতের এমন এক জাদুকরের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন, যাঁর কণ্ঠ সময়কে অতিক্রম করে আজও প্রতিটি প্রজন্মকে একই আবেগে ছুঁয়ে যায়।